পাউবো বলছে, হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নতুন একটি প্রযুক্তি, যা অনেকটা রাবার ড্যামের মতো। ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করার সুযোগ তৈরি হবে। সংরক্ষিত পানি শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহার করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নথি পর্যালোচনা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে তিনটি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল পাউবো। তাদের যুক্তি, হাইড্রোলিক ড্যাম প্রযুক্তির উদ্ভাবক চীন। তাই তারা কাজটি চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেইজিং আইডাব্লিউএইচআর করপোরেশনকে দিয়ে করাতে চায়। কারণ, এই প্রতিষ্ঠানটি আগেও বাংলাদেশে হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণ করেছে।

কিন্তু অভিজ্ঞতা আছে বলেই দরপত্র ছাড়া একক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ড্যাম নির্মাণের বিষয়ে আপত্তি জানায় পরিকল্পনা কমিশন। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণ করে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত তা জানাতে পারেনি পাউবো। শেষ পর্যন্ত ৩০২ কোটি টাকার হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ প্রকল্পটি আটকে দেয় পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর তিনটির পরিবর্তে একটি ড্যাম নির্মাণের প্রকল্প নিয়ে এগোতে বলা হয় পাউবোকে।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মাহবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। আমরা প্রস্তাব করেছি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশন আমাদের একটি ড্যাম নির্মাণের কথা বলেছে।’

চীনের এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ড্যাম নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রস্তাবে পাউবোর কর্মকর্তারা বলেছেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রথম হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ করেছিল এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজটি ছিল বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি)। ২০২০ সালের অক্টোবরে বিএডিসির এই ড্যাম উদ্বোধন করা হয়।

চীন থেকে কন্ট্রোল ইউনিট আনার পক্ষে মত বিএডিসির

বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, হাইড্রোলিক ড্যামের ভালো-খারাপ দুটোই আছে। আনোয়ারায় নির্মিত ড্যামটি পুরোপুরি অটোমেটেড। এটি পরিচালনা করতে সমস্যা হয় কৃষকদের। হাইড্রোলিক কন্ট্রোল ইউনিট পরিচালনা করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয় অনেকের। কারণ, এ ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেকে অভ্যস্ত নয়, ঠিক স্মার্টফোনের মতো।

বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণে স্টিলের প্লেটগুলো এখন বাংলাদেশ স্টিল রি–রোলিং মিলস বা বিএসআরএম তৈরি করতে পারে। আরসিসির কাজও দেশের ঠিকাদারেরা করতে পারেন। যদি প্রয়োজন হয়, শুধু চীন থেকে কন্ট্রোল ইউনিট আনা যেতে পারে।

জানতে চাইলে বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাইড্রোলিক ড্যাম পরিচালনা করতে কিছুটা জটিলতা আছে। এটির পরিচালনা আরও সহজ করা উচিত। আমরা সেটি করার চেষ্টা করছি। তা ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণেও সমস্যা আছে। হাইড্রোলিক ড্যামে সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে।’

পাউবোর কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে বিএডিসির সঙ্গে নতুন ড্যাম নির্মাণের বিষয়ে যোগাযোগ করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। আমাদের মতামতও নেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা যদি দেশের অন্য কোথাও হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণ করি, চীনের ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পুরো কাজ করাব না। চীন থেকে শুধু কন্ট্রোল ইউনিট আনা যেতে পারে।’

খরচ প্রথমটির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি

জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলায় ভরাশঙ্খ খালে বিএডিসির জন্য নির্মিত হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণে খরচ হয়েছিল ২১ কোটি টাকা। এ ড্যামের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৮ মিটার। অন্যদিকে পাউবোর তিনটি ড্যাম নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০২ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি ড্যামের পেছনে খরচ পড়বে ১০০ কোটি টাকারও বেশি। যদিও প্রতিটি ড্যামের দৈর্ঘ্য আলাদা। বিএডিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তিনটি ড্যাম নির্মাণে এত টাকা খরচ হওয়ার কথা নয়।

নথিপত্রে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় শ্রীমাই নদের ওপর হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪ মিটার দৈর্ঘ্যের। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মাইনী নদীর ওপর ড্যামের দৈর্ঘ্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৯০ মিটার। আর রাঙামাটির সাজেক ভ্যালির কাসালং নদীতে ড্যামের দৈর্ঘ্য হবে ২৪ মিটার।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন, ক্রয়পদ্ধতি যথাযথভাবে তৈরি করা হয়নি। এ ধরনের কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রয়পদ্ধতি একক দেশের নাম উল্লেখ করা সরকারি ক্রয়বিধিমালা বা পিপিআর সমর্থন করে না। যদি অন্য কোনো উৎস না থাকে, তখনই একক দেশ থেকে পণ্য বা উপকরণ কেনাকাটা করা যাবে। কমিশন বলছে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণ করে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল পাউবোর কাছে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে জবাব দেয়নি।

কমিশন বলছে, তিনটি ড্যামের প্রয়োজন নেই

এদিকে প্রস্তাবিত তিনটি হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণের আদৌ যৌক্তিকতা আছে কি না, তা জানতে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে পরিকল্পনা কমিশন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় পরিকল্পনা কমিশনের সেচ অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব এনামুল হককে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিকে রাখা হয়।

কমিটি সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পরিকল্পনা কমিশনে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে তারা জানিয়েছে, তিনটি হাইড্রোলিক ড্যামের প্রয়োজন নেই। আপাতত পাইলট আকারে পটিয়ায় শ্রীমাই খালের ওপর একটি ড্যাম নির্মাণ করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাইনী নদীতে প্রস্তাবিত ড্যাম এলাকার সামান্য উজানে খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা সড়ক আছে। একটি সেতু আছে। সেখানে ড্যাম নির্মিত হলে সড়ক ও সেতুর ক্ষতি হতে পারে। তা ছাড়া সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকায় তামাক চাষ করা হচ্ছে। ড্যাম হলে তামাক চাষকে উৎসাহিত করা হবে।

আর সাজেক ভ্যালির পাশে কাসালং নদীতে প্রস্তাবিত ড্যাম কারিগরিভাবে যথোপযুক্ত নয়। সেখানে কৃষি বা রবিশস্যের চাষাবাদের উপযুক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সবকিছু মিলে পটিয়া উপজেলার শ্রীমাই খালের ওপর ড্যাম নির্মাণ করা যেতে পারে বলে কমিটি প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে।

এ বিষয়ে পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন আমাদের একটি ড্যাম নির্মাণের কথা বলেছে। আমরা সে আলোকে কাজ করছি। ফলে প্রকল্পের খরচও কমে আসতে পারে।’

হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যামে পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, হাইড্রোলিক ড্যামে পরিবেশগত ক্ষতি হওয়ার মারাত্মক আশঙ্কা থাকে। ভাটির দিকে নদীভাঙনের আশঙ্কা থাকে। তাই ড্যাম নির্মাণের আগে ওই এলাকায় পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না কিংবা নদীভাঙন হবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা চালানোর তাগিদ দেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন