default-image

সুরক্ষা পোশাকগুলো চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে বাঁচানোর মতো মানের নয়। তবু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প এমন এক লাখের বেশি পিপিই কিনেছে। প্রকল্পের পরিচালক চলতি মাসে ৬৩ জেলায় ১ হাজারটি করে এই পিপিই পাঠিয়ে সেরেছেন।

এগুলো সব প্রথম ধাপের পিপিই। হাসপাতালের জন্য পণ্য ও সেবার মান নির্ধারণ করে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির নির্দেশনা বলছে, প্রথম ধাপের পিপিই হালকা ঝুঁকির পরিবেশের জন্য। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি গুরুতর। তাঁদের দরকার সর্বোচ্চ, অর্থাৎ চতুর্থ ধাপের পিপিই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা এখন খুব সতর্কভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সুরক্ষা পোশাক বা পিপিই বাছাই করেন। প্রকল্পের পিপিইগুলোর দায় তাঁদের নয়। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চলা এ প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার পরিচালক ইকবাল কবির। তিনি এগুলো কেনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

ইকবাল কবিরই জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রতি জেলার সিভিল সার্জনদের কাছে এগুলো পাঠাচ্ছেন। তিনি অধিদপ্তরের পরিকল্পনা, মনিটরিং ও গবেষণা কর্মসূচিরও লাইন ডিরেক্টর। অথচ খোদ অধিদপ্তর এগুলো গুদামে তুলতে দেয়নি। ইতিমধ্যে ঢাকা বাদে সব জেলায় এই পিপিই চলে গেছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি রোববার প্রথম আলোকে বলেছেন, দিন চারেক আগে কুরিয়ারে ৪০টি করে পিপি
ই ভরা ২৫টি কার্টন এসে পৌঁছেছে। সঙ্গে প্রেরকের বিবরণ ছিল না।

 ‘বুঝিয়া পাইলাম’ লিখে গুদামের কর্মচারী সেগুলো রেখে দিয়েছেন।

ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন মঈনুল হোসেন বলেছেন, এখনো হাতে পাননি। আর গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. খাইরুজ্জামান বলেছেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে পিপিই আসছে, দেখে বলতে হবে।

এখন পর্যন্ত দেশে হাজারের বেশি চিকিৎসকসহ কমবেশি সাড়ে তিন হাজার স্বাস্থ্যকর্মী কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৪০ জনের বেশি। চিকিৎসকদের বড় অংশ এর জন্য দায়ী করেছেন মানসম্মত পিপিই ও এন-৯৫ মাস্কের অভাবকে।

আবুল কালাম আজাদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মালামাল প্রকল্প পরিচালক কিনতে পারেন। জেলায় পাঠাতেও পারেন। তাঁর কিছু জানা নেই।

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের টাকায় কোভিডের আপৎকালে নেওয়া। নাম, ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রজেক্ট। সংক্ষেপে ইআরপিপি। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের বাজেট এক হাজার কোটি টাকার বেশি। পিপিইর জন্য বরাদ্দ ছিল ৫০ কোটি টাকার বেশি।

প্রকল্পের কাগজপত্রে একেকটি পিপিইর দাম ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকার কাছাকাছি। কেনার কথা ছিল ১ লাখ ৮ হাজারটির কিছু কম। ইতিমধ্যে কেনা হয়েছে ১ লাখ ২০০টি। কেনাকাটাসংক্রান্ত কোনো চুক্তিপত্র বা রসিদ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। তাই কাগজপত্রে দাম এবং পাঠানোর খরচ কত দেখানো হয়েছে, তা জানা যায়নি।

তবে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্পের পরিচালক কেনাবেচার একটি অভিন্ন দর বলেছেন। সেটা ধরে হিসাব করলে মোট খরচ দাঁড়ায় সোয়া ১২ কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ যতগুলো পিপিই কেনার কথা ছিল, তার প্রায় সব কেনার পরও বরাদ্দের সিকি ভাগও খরচ হয়নি।

বাকি টাকায় কী করা হবে? পরিচালক ইকবাল কবির প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের তিন বছরে আরও অনেক জিনিসেরই প্রয়োজন হবে। সেখানে কাজে লাগবে।

পত্রপাঠ পিপিই

ইকবাল কবির ৪ জুন সিভিল সার্জনদের একটি চিঠি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, দেশের ৮টি বিভাগের প্রতি জেলায় মোট ৬৪ হাজার পিপিই পাঠাচ্ছেন। এগুলো কোভিড-১৯ রোগীদের সেবা, সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং নমুনা সংগ্রহ করার কাজে ব্যবহারের জন্য।

করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত নারায়ণগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন মো. ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা পিপিই পেয়ে বিলি করে সেরেছেন। তবে কোভিড রোগীদের সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের দেননি। তাঁরা এগুলো পাঠিয়েছেন কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য, যাঁরা বহির্বিভাগে সাধারণ রোগীদের সেবা দেন।

চতুর্থ ধাপের পিপিইর দুটি প্রধান শর্ত হচ্ছে কাপড়ের উন্নত মান এবং আটালো ফিতা সেঁটে সেলাইয়ের ছিদ্র বন্ধ করা। উদ্দেশ্য, ভাইরাস যেন কিছুতেই ঢুকতে না পারে। পিপিইগুলো কেনা হয়েছে এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশনস লিমিটেডের কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা এমন ফিতা সেঁটে দিতে পারতেন।

সাইফুর বলেন, প্রকল্প পরিচালক আপাতত প্রথম ধাপের সাধারণ পিপিই চেয়েছিলেন। কার্যাদেশ তিনি পেয়েছিলেন এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে।

গত ৯ মে পিপিইর মান যাচাইয়ের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক শাহনীলা ফেরদৌসী প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি এই কেনাকাটার কথা কিছুই জানতেন না। কমিটির আরেক সদস্য পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. শরীফও একই কথা বলেন।

default-image

প্রকল্প পরিচালক ইকবাল কবির প্রথম আলোকে বলেছেন, যাচাই-বাছাইয়ের দরকার পড়েনি। কমিটিকে জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। কাগজপত্রে অবশ্য বলা আছে, কমিটি পিপিইসহ সব সুরক্ষাসামগ্রীর মান পরীক্ষা করে চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে লিখিত মতামত জানাবে।

কিন্তু প্রথম ধাপের পিপিই কেনা হলো কেন? ইকবাল কবির প্রথমে বললেন, সে সময় বাজারে ভালো মানের পিপিই ছিল না। তারপর বললেন, এগুলো সংবাদকর্মীদের মতো প্রথম সারিতে থাকা মানুষজন ব্যবহার করতে পারবেন।

সিভিল সার্জনদের চিঠিতে কেন তবে এগুলো কোভিড রোগীদের সেবায় নিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মী ও নমুনা সংগ্রাহকদের ব্যবহার করতে বলা হয়েছে? ইকবাল কবিরের উত্তর, এটা ভুলবশত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কারও ভুলের কারণে চিকিৎসক আক্রান্ত হবেন, মারা যাবেন, এটা তো হতে পারে না। এই ভুলের কারণে তো সর্বনাশ হতে পারে।

অধিদপ্তরের গুদামে

কোভিড-১৯ মোকাবিলা কার্যক্রমে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত ১৪ মে বেশ কিছু কার্টন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসে পৌঁছায়। ট্রাকের লোকজন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্যাডে লেখা একটি তালিকা দিয়ে গুদামের কর্মচারীদের বলেন, এগুলো বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের পিপিই।

কিন্তু তালিকায় শুধু কার্টন ও পিপিইর সংখ্যা লেখা ছিল। কার্টনের গায়েও পিপিইর ধরন বা অন্য কিছু লেখা ছিল না। গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী মো. জিনারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মহাপরিচালকের অনুমোদন না থাকায় তিনি মাল গ্রহণ করেননি।

ইকবাল কবির অবশ্য প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি অধিদপ্তরের সরবরাহ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত অনলাইন পোর্টালে মোট পাঠানো পিপিইর হিসাব দিয়েছেন। এই পোর্টালে পিপিইর সরবরাহ, উৎস ও ধরনের বিবরণ থাকে। এরই ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত সম্পর্কে জানায়।

এই প্রতিবেদক ৬ জুন ঢাকার মহাখালীতে স্বাস্থ্য ভবনে গিয়ে দেখেন, গ্যারেজে রাখা কার্টন জেলায় পাঠানোর তোড়জোড় চলছে। কার্টনের গায়ে লেখা, ‘অ্যাপ্রুভড পিপিই, ডিজিএইচএস কোভিড-১৯, ইআরপিপি প্রজেক্ট’।

একজন দিনমজুর কার্টনগুলোর গায়ে ‘লেভেল-১’ (প্রথম ধাপ) লেখা স্টিকার সাঁটছিলেন। তদারক করছিলেন তাপস চন্দ্র নামের অধিদপ্তরের একজন অফিস সহকারী। ১৮ জুন ফোনে তাপস বলেন, ঢাকা ছাড়া সব জেলায় মাল চলে গেছে।

চড়া দরের পিপিই

প্রকল্পের কাগজপত্রে পিপিইর দর ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৭০০ টাকা। ইকবাল কবির প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কিনেছেন ১ হাজার ২০০ টাকা দরে। ছিদ্র বন্ধ নেই, তবে কাপড় ভালো।

অনলাইন বাজার আলিবাবা এক্সপ্রেসের ওয়েবসাইট বলছে, কমপক্ষে এক হাজারটি কিনলে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদিত পিপিইর পাইকারি দর পড়বে ৮০৭ টাকা থেকে ১ হাজার ২০ টাকার মধ্যে। আরও ভালো মানের পিপিই ২ হাজারটির দর ৮৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২৭৫ টাকা। এগুলোতে সেলাইয়ের ছিদ্র সেঁটে বন্ধ করা আছে।

আলিবাবাতে বন্ধ না করা পিপিইর দর ৪৯৩ টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। রাজধানীর লাজ ফার্মায় সেলাই না সাঁটা পিপিইর খুচরা দাম ৪৫০ থেকে ৯৫০ টাকা।

প্রকল্পের কাগজপত্রে তবে অত বেশি দর ধরা হয়েছিল কেন? ইকবাল কবিরের উত্তর, ‘আপনিও তো দেখি অন্য সাংবাদিকদের মতো কথা বলেন! এটা পিপিই কমপ্লিট সেটের দাম। এর মধ্যে মাস্ক, গগলস, হেডকভার সবই আছে।’ কাগজপত্রে কিন্তু আলাদা করে গগলস আর বুটজুতার দর ধরা আছে, বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি।

ইকবাল কবির আরও বলেছেন, বিশ্বব্যাংক নিজস্ব ধারায় কেনাকাটা করতে চাইছে। প্রকল্পের কাগজপত্রে কিন্তু পরিষ্কার বলা আছে, কেনাকাটার চুক্তি থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ দায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তাবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই কেনাকাটা নিয়ে আরেকটি অভিযোগের তদন্ত করছে দুদক। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, সেটারও কোনো সুরাহা হয়নি। এসব নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0