দ্বিতীয় পর্ব

দিনাজপুর ও নীলফামারীর গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর

বিজ্ঞাপন
default-image
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়। এটা বিশ্বের নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড। এখন আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি মেলেনি। বিশ্বেও অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় এ হত্যাকাণ্ড চলে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে এক হাজারের ওপর। বধ্যভূমি থেকে অসংখ্য মাথার খুলি, শরীরের হাড়গোড় ও চুল পাওয়া গেছে। ৬৪ জেলার গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরে সংক্ষিপ্তভাবে বিবরণের ধারাবাহিক থাকবে নাগরিক সংবাদে। আজ থাকছে দিনাজপুর ও নীলফামারীর গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

দিনাজপুর

হোম সিগন্যাল বধ্যভূমি, পার্বতীপুর
১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে শহরের মাঝখানে পার্বতীপুর রেলস্টেশন থেকে কয়েক শ গজ উত্তরে হোম সিগন্যালের কাছে সবচেয়ে বড় গণকবরটি আবিষ্কৃত হয়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি সেনারা গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতিদিন স্বাধীনতাকামী নিরীহ বাঙালি নারী-পুরুষকে ধরে এনে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হতো। এখানে হানাদাররা হত্যা করে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সতীশ সরকার ওরফে মনুদা, ব্যাংক অফিসার সজিরুদ্দিন, দিনাজপুর সরকারি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ওয়াহিদুর রহমান, ওয়াপদা প্রকৌশলী ওবায়দুল হক, দিনাজপুর হাসপাতালের সহকারী সার্জন এম এ জব্বার, ভাসানী ন্যাপের কর্মী ইসমাইল হোসেনসহ অনেককে।

স্টেশন এলাকা বধ্যভূমি, পার্বতীপুর
পার্বতীপুরের স্টেশন এলাকায় বধ্যভূমিতে প্রায় ২০ হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়।

সেতাবগঞ্জ থানা বধ্যভূমি
সেতাবগঞ্জে চিনিকলের জন্য বিখ্যাত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনী দিনাজপুরে প্রতিরোধের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জেলার সব কটি বর্ডার আউট পোস্ট বা বিওপি থেকে বাঙালি ইপিআরদের একত্র করার ক্ষেত্রে সেতাবগঞ্জ চিনিকলের গাড়িগুলো সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। সে জন্য পাকিস্তান বাহিনীর আক্রোশ ছিল সেতাবগঞ্জের চিনিকলের ওপর। তারা চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় বাঙালিদের ধরে এনে নির্যাতনের মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ছাড়া বিরল, কাহারোল ও বীরগঞ্জ থেকে সন্দেহভাজন বাঙালিদের ধরে এনে সেতাবগঞ্জ থানা উন্নয়ন কেন্দ্রের সামনে ও সেতাবগঞ্জ–দিনাজপুর রোডের এক মাইল এলাকাজুড়ে প্রতিনিয়ত অগণিত নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করা হতো।

বাড়াই আখিরা গ্রাম বধ্যভূমি, ফুলবাড়ী
ফুলবাড়ী উপজেলার বাড়াই আখিরা গ্রামে পাওয়া যায় অনেক স্বাধীনচেতা মানুষের দেহাবশেষ, গণহত্যার চিহ্ন। আখিরা বধ্যভূমিতে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বেলা ১১টায় শতাধিক নিরস্ত্র মানুষকে নির্মমভাবে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হামলার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নবাবগঞ্জ, বিরামপুর ও ফুলবাড়ী এলাকার মানুষ ভয়ে গ্রাম ছেড়ে ভারতের দিকে পালানোর সময় এ ঘটনা ঘটে।

নবাবগঞ্জ বধ্যভূমি
নবাবগঞ্জ উপজেলার চকদুলু ছিল গণকবর-বধ্যভূমি। এখানে প্রায় ২৫০ জন মানুষের গণকবর রয়েছে।

চড়ারহাট গণকবর, নবাবগঞ্জ
নবাবগঞ্জ উপজেলার চড়ারহাট ও আন্দোল গ্রামে এক নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলি করে দুটি গ্রামে ১৫৭ জনকে হত্যা করে। ৯ অক্টোবর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চড়ারহাট ও আন্দোল গ্রাম ঘেরাও করে। অস্ত্রের মুখে দুটি গ্রামের সব পুরুষকে একত্র করে। তাঁদের বলা হয় দলার দরগায় ভেঙে যাওয়া কালভার্ট মেরামত করার জন্য। কিন্তু ওখানে দেখে ভিন্ন এক চিত্র। সবাইকে একে একে করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা লাইনে দাঁড়াতে বলেন। এ কথা শোনার পর গ্রামবাসী ভয়ে আতঙ্ক হয়ে পড়ে। দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করলে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়ে ১৫৭ গ্রামবাসী।

বেহালা গণকবর
জেলার বিরল উপজেলার বেহালা গ্রামে ১৫০ জন শহীদের একটি গণকবর রয়েছে।

চিরিরবন্দর বধ্যভূমি, চিরিরবন্দর
মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের বালুপাড়া গ্রামের বহু মানুষকে হত্যা করে কাঁকড়া নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় চিরিরবন্দরের বিভিন্ন পুকুর, খাল ও নদীর পাড়কে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানকার বহু পুকুরপাড়েও রয়েছে গণকবর।

হিলি বধ্যভূমি
১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হিলি দখল করে চারদিকে অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক হারে গণহত্যা চালায়। ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও বিহারিরা হিলির পালপাড়া গ্রামে আক্রমণ করে প্রথমে গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং পরে গুলি করে হত্যা করে।

রামসাগর বধ্যভূমি, রামসাগর
দিনাজপুর সদরের রামসাগর গ্রামে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ জনের গণকবর পাওয়া যায়।

গোদাগাড়ী বধ্যভূমি
দিনাজপুর সদরের গোদাগাড়ী গ্রামে ১৫০ শহীদের গণকবর পাওয়া যায়।

টেলিফোন ভবন গণহত্যা
দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারে তিনতলা একটি ভবন ছিল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ধরে নিয়ে হত্যা করত। এখানে বেশি ভাগেই শিশু ও নারীদের হত্যা করা হয়।

পার্বতীপুর ইউনিয়নের টিকরামপুর গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল, বেলা দুইটায় এখানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। অনেক মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

কাঞ্চন নদের বধ্যভূমি
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও দোসররা মিলে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে দিনাজপুরের কাঞ্চন নদে ফেলে দেয়। নদের কয়েকটি নালায় লাশে ভরে গিয়েছিল। নদের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা ছিল লাশের ভিড়। অনেকের মতে, এখানে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।

পার্বতীপুর বয়লারে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও দোসরদের সহযোগিতায় আশপাশের নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে পার্বতীপুরের রেলইঞ্জিনের উত্তপ্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারা হতো।
প্রত্যক্ষদর্শীরে মতে, এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

পালপাড়া গ্রাম গণহত্যা
দিনাজপুরের হাকিমপুরে বাংলা হিলির পালপাড়া গ্রামে ১৯৭১ সালে ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিহারি ও রাজাকারদের সহযোগিতায় বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে নির্বিচারে সাতজনকে হত্যা করে। এখানে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া দিনাজপুরের দেবীগঞ্জ বধ্যভূমি, ঘোড়াঘাট বধ্যভূমি, বীরগঞ্জ বধ্যভূমি, কাহারোল, খানসামা বধ্যভূমি, গণকবর-বধ্যভূমি পাওয়া যায়।

নীলফামারী
গোলাহাট বধ্যভূমি, সৈয়দপুর
সৈয়দপুর রেলস্টেশনের অদূরে অবস্থিত গোলাহাট ছিল একাত্তরের অন্যতম বধ্যভূমি। ১৩ জুন এখানে সংঘটিত হয় বীভৎস গণহত্যা। ওই দিন সৈয়দপুর বসবাসরত মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের ৪১৩ জন মানুষকে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী স্থানীয় বিহারিরা সৈয়দপুর রেলস্টেশনে জড়ো করে এবং ট্রেনে করে তাদের দুই মাইল উত্তরে গোলাহাটের কাছে নিয়ে যায়। এরপর সেখানকার কালভার্টের ওপর ট্রেন থামিয়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর এই বধ্যভূমি থেকে শহীদদের ব্যবহার্য অনেক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।

টেকনিক্যাল স্কুল বধ্যভূমি, সৈয়দপুর
টেকনিক্যাল স্কুল বধ্যভূমিটিকে হত্যা ও নারী নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত করে। ১ এপ্রিল মেজর গুল, মেজর জাভেদ বখতিয়ার, কর্নেল শফিসহ কয়েকজন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার বাড়ি থেকে ধরে এনে প্রকৌশলী ফজলুর রহমান, তাঁর ভাই রফিকুল ইসলাম, ভাগনে আনোয়ার হোসেন এবং রুহুল আমিনকে এখানে হত্যা করে। ফজলুর রহমানের স্ত্রীকে ও আরও অন্তত ৬০০-৭০০ জন নারীকে এ স্কুলে আটকে রেখে দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।

জলঢাকা গণহত্যা (কালিগঞ্জ বধ্যভূমি)
১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ভারতে যাওয়ার জন্য নীলফামারীর জলঢাকার গোলনা ইউনিয়নের কালিগঞ্জে এসে বালাগ্রাম ইউনিয়ন গ্রামবাসী পৌঁছালে সেখানে তাদের নৃশংস গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। ওই ঘটনায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৩০০ মানুষ প্রাণ হারান।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নৃশংস গণহত্যা
১৯৭১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ এপ্রিল রেলওয়ে কারখানায় সবচেয়ে বড় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। তিন দিনে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সৈয়দপুর শহরের সাধারণ মানুষ এবং সেই সঙ্গে গ্রামের ৩৫০ জন নিরীহ মানুষকে ধরে এনে কারখানার ভেতরে হত্যা করা হয়। এখানে অভিনব এক পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়। রেলওয়ে কারখানার ৩টি বিশাল আকারের বয়লার ও ফার্নেসের মধ্যে মানুষ নিক্ষেপ করা হয়। উল্লেখ্য, বয়লার ও ফার্নেস লোহা গলানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। ফার্নেসের মধ্যে মানুষের দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং তাদের দেহাবশেষের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তিন দিনের গণহত্যার নেতৃত্ব দেয় অবাঙালি মতিন হাশমি, মো. হব্বু, মো. জাহিদ ও রেলওয়ের আরও অনেক অবাঙালি কর্মচারী। বর্বরোচিত এ গণহত্যার সময় নিরীহ ও নিরপরাধ বাঙালিরা সেদিন চিৎকার করে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন, কিন্তু অবাঙালিরা তাঁদের কাকুতি-মিনতি শোনেনি । (১২ মার্চ ২০১৭, ভোরর কাগজ)

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ’৭১–এর গণহত্যা ’৭১ সম্পাদিত আবু সাঈদ; একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর; সুকুমার বিশ্বাস, পৃ.-৪৪৮ দৈনিক সংবাদ, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৩, যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ ডা. এম এ হাসান, পৃ.-৩০৬, ৪১৩ দৈনিক বাংলা, ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২, ভোরের কাগজ, ১২ মার্চ ২০১৭, প্রথম আলো

*আগামীকাল ৪ ডিসেম্বর ২০১৯ পড়ুন: রংপুর ও কুড়িগ্রামের গণহত্যা, গণকবর ও বধ্যভূমি
*দিনাজপুর ও নীলফামারীর আরও যদি গণহত্যা, গণকবর কিংবা বধ্যভূমিসংক্রান্ত খবর থাকে অনুগ্রহ করে মেইলে জানাবেন

আবু সাঈদ: কবি, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
abusayedone@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন