default-image

ন্যাড়া মাথা প্যাঁকাটে শরীর পিংকির। শরীরটা যা-ই হোক, দুচোখ ভরা স্বপ্ন ১৪ বছরের এই কিশোরীর। বড় হয়ে কী হবে? জানতে চাইলে সে মিষ্টি হেসে বলল, ‘নৌবাহিনীতে যোগ দেব। ’ অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া পিংকি সাহা তার স্কুলে ৭০ থেকে ৮০ জন স্কাউট সদস্যের মধ্যে অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রুপ লিডার।
পিংকি ক্যানসারে ধুঁকছে। জ্বরার ভারে জীর্ণ শরীর, কিন্তু দুচোখে ভরা এখনো স্বপ্ন অমলিন—একদিন ফিরে যাবে স্বাভাবিক জীবনে। সে ছুটবে, ফুল ফুটবে। সে গাইবে জীবনের গান।
পিংকি বলে, ‘লিডারশিপ পাওয়া কিন্তু অনেক কঠিন কাজ। চারটি ধাপে ১৬টি ব্যাজ পাওয়ার পরই লিডারশিপ পাওয়া যায়। এখন আরেকজনকে আমার দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছে। তবে আমি সুস্থ হলেই আবার লিডারশিপ ফিরে পাব।’
ছাব্বিরের বয়স ১০ বছর। তার মাথার বিভিন্ন জায়গা ফুলে আছে। নিস্তেজ কণ্ঠ। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছয় থেকে সাত মাস ধরে সে স্কুলে যেতে পারছে না। স্কুলের কথা বলতেই চোখ একটু বড় বড় করে তাকাল। জানাল, স্কুলে যেতে আর ছবি আঁকতে তার ভালো লাগে। কিন্তু ছাব্বিরের ফুরফুরে স্বপ্নও দুরন্ত ক্যানসারের জালে বন্দী। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পিংকি ও ছাব্বিরের সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে ওরা দাঁড়িয়ে।
ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু ক্যানসার বিভাগ পিংকিদের স্বপ্নগুলো ধরে রাখতে চায়। বিভাগটি কয়েক বছর ধরে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব শিশু ক্যানসার দিবসে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেখানে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করা শিশুদের পুরস্কার দেওয়া হয়। অন্যদের জন্যও থাকে নানা পুরস্কার। পরে ছবিগুলো লেমিনেটিং করে হাসপাতালের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়। অনেক শিশু হয়তো শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে না। কিন্তু তাদের স্বপ্নগুলো লেমিনেটিং করা ছবিতে জীবন্তই থাকে।
এবার চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পিংকি এঁকেছে কাশফুল। নদীতে নৌকা। সূর্য উঠছে। হলুদ চাল দেওয়া একটি লম্বাটে স্কুল ভবন। স্কুলের পাশেই পতপত করে উড়ছে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। এ ছবি এঁকে পিংকি তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে। দুই বাটির একটি হটপট পেয়েছে। পিংকির চোখে আবার স্বপ্নের ঝিলিক। সে জানিয়ে দিল, স্কুলে এই হটপটে করেই সে টিফিন নিয়ে যাবে।
ছাব্বিরের লিকলিকে হয়ে যাওয়া হাতে শক্তি নেই। সে একটি আইসক্রিমে রং করেছে।
গত বছরের জানুয়ারি মাসে শরীরের পেছন দিকে একটি টিউমার হয় পিংকির। হাসপাতালে পিংকির কেমোথেরাপি চলছিল। পিংকিই বলল, কেমো দেওয়ার পর বমি হয়। তখন খুব কষ্ট হয়। খাবার খেতে ভালো লাগে না। শরীর ব্যথা করে।

default-image

পিংকির মা করুণা সাহা জানান, পিংকি ভালো নাচতে পারে। টেলিভিশনেও নেচেছে ও। ভালো গাইতেও পারে। জাপানে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েও শুধু অসুখের কারণে তার যাওয়া হয়নি।
পিংকির বাবা অমর সাহা পেশায় কাঠমিস্ত্রি। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন চিকিৎসক পিংকির টিউমারকে ফোঁড়া মনে করে যে যাঁর মতো করে চিকিৎসা করেছেন। ছয়-সাত মাস পর মা–বাবা পিংকিকে ক্যানসার হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। কেমোথেরাপির পঞ্চম সাইকেল চলছে। আরও দিতে হবে সাতটি সাইকেল। হাসপাতালে সরকারি সরবরাহ না থাকলে একেক সাইকেলে খরচ পড়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ তো আছেই।
ছাব্বিরের বাবা কুষ্টিয়ায় ট্রাক চালান। ছাব্বিরের মা শাহানা বেগম জানান, গত দুই বছরে নিজেদের যা ছিল এবং আত্মীয়দের কাছ থেকে এনে প্রায় আট লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ছাব্বিরকে এ হাসপাতালে প্রথম ভর্তি করা হয় গত বছরের জুলাই মাসে। তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দেশে চলমান হরতাল–অবরোধে ছাব্বিরের বাবা ট্রাক চালাতে পারছেন না। ফলে ছেলের চিকিৎসা করাতে আপত্তি জানানো শুরু করেছেন।
শাহানা বেগম বলেন, ‘চোখের সামনে ছেলের কষ্ট তো আর সহ্য হয় না। তাই অন্যদের কাছ থেকে ধারদেনা করে আসছি।’
শাহানা বেগম নিজেও বুঝতে পারছেন তাঁর ছেলে হয়তো আর খুব বেশি দিন বাঁচবে না। কিন্তু মায়ের মন। তাই পাশেই দাঁড়ানো শিশু ক্যানসার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মমতাজ বেগমের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমার ছেলে আবার শরীরে জোর পাইবো তো?’ মমতাজ বেগম এই মাকে সরাসরি নিরাশ না করে শুধু সান্ত্বনা দিলেন।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের ক্যানসার ক্রমাগত বাড়ছে। ২০০৮ সালে এ বিভাগে ১৯১ জন শুধু নতুন রোগী ভর্তি হয়। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৮০ জন। বহির্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন আসছে ২০ থেকে ২২ জন শিশু রোগী। গত বছরে মোট ছয় হাজারের বেশি শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। অবস্থা বেশি খারাপ হলে অনেক পরিবারই আর চিকিৎসা করাতে চায় না। তখন শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে যান। এতে হাসপাতালে মৃত্যুর হার খুব কম। এ ছাড়া শিশু বিভাগে চোখ, টিউমার, হাড়ের ক্যানসারের রোগীরা ভর্তি হচ্ছে। রক্তসংক্রান্ত ক্যানসার রোগীরা ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের অধীনে। ফলে এই শিশুরা হিসাব থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।

default-image

শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মমতাজ বেগম প্রথম আলোকে বলেন, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথিসহ বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে অভিভাবকেরা সন্তানকে বলতে গেলে একদম শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসছেন। তখন আর তেমন কিছু করার থাকে না। এ জন্য যথাযথ রেফারেল সিস্টেম থাকা জরুরি। এ ছাড়া শিশুকে কেমোথেরাপি দিয়ে ছেড়ে দিলেই হবে না। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপিসহ সমন্বিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রটোকল মানা জরুরি। বিশেষজ্ঞ জনবলের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য স্ক্রিনিং ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
জানা গেল, এখন পর্যন্ত মাত্র আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার জন্য পদ তৈরি করা হয়েছে। অবকাঠামোসহ অন্য বিষয়গুলো জোরদার করা হয়নি। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শিশুর ক্যানসারের লক্ষণ: শিশু ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে অবসাদে ভুগতে থাকা, জ্বর, আঘাত বা সংক্রমণের লক্ষণ ছাড়া শরীরের কোনো অংশ যদি ফুলে যায় বা চাকার মতো দেখা যায়, চোখের মণি সাদা হয়ে যাওয়া বা বিড়ালের চোখের মতো জ্বলজ্বল করা, চোখের চারপাশে ফুলে বা কালো হয়ে যাওয়া, বাইরের দিকে চোখ বের হয়ে আসা, তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বমি, খাবারে অরুচি, কোনো কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, আঘাত ছাড়াই গিড়া বা জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, কালচে নীল দাগ হওয়া, শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তপাত হওয়া। শিশুদের মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসককে দেখাতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন