default-image
>
  • নূর চৌধুরীর বিষয়ে কানাডার আদালতে গত মাসে মামলা করেছে বাংলাদেশ
  • যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে
  • বাকি চারজনের বিভিন্ন তথ্য

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার রায় কার্যকরের আট বছর পরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় খুনির চারজনের অবস্থান সম্পর্কে সরকার নিশ্চিত হতে পারেনি। অন্য দুজনকে ফেরাতে সরকারের কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, কানাডায় অবস্থানরত এস এইচ এম বি নূর চৌধুরীর বিষয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় আদালতে গত মাসে মামলা দায়ের করেছে বাংলাদেশ। আর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এ এম রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ২০১৫ সালে নিযুক্ত আইনি পরামর্শক সংস্থা স্কাডেন এলএলপিকে এ কাজে যুক্ত করেছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কথা বলে জানা গেছে, গত মাসে কানাডায় মামলা দায়েরের পর থেকে আইনি পরামর্শক সংস্থা টরি এলএলপি কাজ করছে এবং কিছুটা অগ্রগতি আছে। কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এ বিষয়ে আদালতকে তথ্য জানাতে সময় চেয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে আদালতের কাছে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের তথ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরানোর প্রক্রিয়ার কাজে যুক্ত ওই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, রাশেদ চৌধুরীকে ফেরানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে গত কয়েক বছর যোগাযোগ করা হয়। একপর্যায়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, কূটনৈতিক পথে এ নিয়ে খুব বেশি এগোনোর সুযোগ নেই। এটা জানার পর রাশেদ চৌধুরীকে ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে স্কাডেন এলএলপি।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরাতে সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে গত সোমবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে কথা হয়। আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খুনিদের মধ্যে চারজনের অবস্থান সম্পর্কে সরকারের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। বাকি দুজনের একজন যুক্তরাষ্ট্রে আছেন; তাঁকে ফিরিয়ে আনার আলাপ-আলোচনা চলছে। আদালতের আশ্রয় নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীকে বর্তমান সরকারের মেয়াদে ফেরত আনার কথা অতীতে বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কোনো সময় নির্ধারণ করে দেব না। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু এটা এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে। আমেরিকারটা অতটা না, কানাডারটা কঠিন হয়ে গেছে। সে জন্যই আমরা অনেক রকম পন্থা অবলম্বন করছি-আইনি পন্থা, আলাপ-আলোচনার পন্থা। এগুলো চালিয়ে যাচ্ছি।’

কানাডার আদালতে মামলা
বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ বারবার অনুরোধ জানালেও সাড়া দেয়নি কানাডা। তাই বিষয়টি সুরাহার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বাংলাদেশ। কানাডার আদালত ২০০৭ সালে দ্বিতীয়বারের মতো নূর চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ফেরতের বিষয়ে ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রক্রিয়া বা প্রি-রিস্ক রিমুভাল অ্যাসেসমেন্টের (পিআরআরএ) পিটিশন দাখিল করেন নূর চৌধুরী, যার সুরাহা এখনো হয়নি। আবেদনে নূর চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে ফিরে এলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তাই তিনি কানাডায় বসবাসের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। অথচ নূর চৌধুরীর ওই আবেদন ৯ বছর ধরে ঝুলে আছে। তাই এটি সুরাহার জন্যই বাংলাদেশ সম্প্রতি কানাডার আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জুন মাসের ৭ তারিখ আবেদন জানানোর পর ওই মাসে চার দফায় এ নিয়ে আদালতে বিভিন্ন ধরনের নথি উপস্থাপন করে বাংলাদেশ। এরপর জুলাইয়ে বাংলাদেশের মামলা নথিভুক্ত করেন কানাডার ফেডারেল আদালত। ১০ জুলাই আদালতের কাছে সময় চেয়ে আবেদন করে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর। এরপর ১৬ জুলাই আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরকে ১৫ দিনের মধ্যে বক্তব্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী এ মাসের ৩ তারিখ নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর। এখন এ নিয়ে শুনানি হবে।

নূর চৌধুরীর বিষয়ে কানাডার সঙ্গে আইনি লড়াই প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, কানাডার আইন অনুযায়ী, যদি কোনো দেশে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে এবং সেই দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে এমন কোনো আসামিকে দেশটি ফেরত পাঠায় না। এ কারণে আইনি ব্যবস্থা পদক্ষেপের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা কতটা ঘৃণ্য অপরাধ, সেটা কানাডার সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।

বাকি চারজনের বিভিন্ন তথ্য
গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক খুনিদের মধ্যে শরিফুল হক ডালিমকে স্পেনে এবং মোসলেম উদ্দিনকে জার্মানিতে দেখা গেছে। কিন্তু ওই দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলে জানা গেছে, এই দুজনকে এখন আর স্পেন ও জার্মানিতে দেখা যাচ্ছে না। ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে তাঁদের চলাফেরার বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি গত এক বছরে তাঁদের পাকিস্তানে দেখা যাওয়ার তথ্যও আছে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর কাছে।

এ ছাড়া অসমর্থিত নানা সূত্রে আবদুল মাজেদকে সেনেগালে দেখার কথা শোনা যায়। তাঁদের যখন যে দেশে দেখা গেছে, তার ভিত্তিতে সরকার গোপনীয়তার সঙ্গে সে দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে এ নিয়ে পাকিস্তানকে চিঠি লিখে কোনো জবাব পায়নি সরকার।

সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল এই প্রতিবেদককে জানান, পলাতক খুনিদের সবাই এখন বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, যতই দিন যাচ্ছে, ততই কঠিন হয়ে পড়ছে পলাতক খুনিদের ফেরানো। কারণ, পশ্চিমা দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে মত জোরালো হচ্ছে। অতীতে, বিশেষ করে রায় কার্যকরের আগে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের ফেরানোর সুযোগ এসেছিল, কিন্তু তখনকার সরকারগুলো সে সুযোগ নেয়নি। যেমন ২০০৪ সালে কানাডার একটি আদালত নূর চৌধুরীর শরণার্থী-সংক্রান্ত একটি আবেদন খারিজ করে তাঁকে বহিষ্কারের আদেশ দেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০০৭ সালে নিম্ন আদালতের ওই আদেশ বহাল রাখেন উচ্চ আদালত। তখন নূর চৌধুরীকে ফেরানোর একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি এটাও উল্লেখ করা যায়, বেশ কয়েক দফা আবেদন করে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভে ব্যর্থ এ কে এম মহিউদ্দিনকে ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার দায়ে উল্লিখিত ছয়জনসহ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত। বাকি ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। তাঁরা হলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মুহিউদ্দিন আহমেদ। আরেক খুনি আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে মারা গেছেন।

খুনিদের চাকরি হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে
১৯৭৬ সালের ৮ জুন প্রকাশিত এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের সবাইকে বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান ও খন্দকার আবদুর রশীদ ছাড়া অন্যরা চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এর মধ্যে নূর চৌধুরী ১৯৭৬ সালে ইরানের বাংলাদেশ দূতাবাসে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে আলজেরিয়া ও ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাসে বদলি হন। সর্বশেষ ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি হংকংয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। ওই বছরই তিনি কানাডায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কানাডার রাজধানী টরন্টোর ১৩ কিলোমিটার দূরে ইটোবিকোকে তিনি এখন অবস্থান করছেন।

রাশেদ চৌধুরী ১৯৭৬ সালে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তিনি কেনিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাসে বদলি হন। ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁকে ওই বছরের জুলাইয়ে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি ব্রাজিলের সাও পাওলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো চলে যান।

১৯৭৬ সালে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পান শরিফুল হক। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত হংকংয়ে কর্মরত ছিলেন। হংকং থেকে ওই বছরই তাঁকে কেনিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বদলি করা হয় এবং ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0