default-image

তুলে নিয়ে যাওয়ার পর দিদারুল ভূঁইয়াকে চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় টানা সাত ঘণ্টা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও জেরা করা হয়েছিল ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ নিয়ে। দিদারুলের ধারণা, ‘রাষ্ট্রচিন্তা’কে ভয় দেখাতে তাঁকে মামলায় ফাঁসানো হয়।

রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট ক্রমাগত চিহ্নিত করা ও সমাধানের পথ খোঁজার একটি রাষ্ট্রনৈতিক উদ্যোগ—এভাবে নিজেদের পরিচয় দেয় রাষ্ট্রচিন্তা। দিদারুল এই সংগঠনের একজন সদস্য। জামিনে মুক্তির পর ৫ নভেম্বর তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সেই একই মামলার আসামি মিনহাজ মান্নানও জামিন পেয়েছেন। তবে গ্রেপ্তারের ছয় মাস পরও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক ও ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদের জামিন হয়নি।

গত ১ অক্টোবর দিদারুল ভূঁইয়া কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রোজার সময় ‘কথাবার্তা’ বলার জন্য র‍্যাব-৩ অফিসে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে, সেই মামলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সামান্যই। চোখ বাঁধা অবস্থায় তিন দফায় তাঁর সঙ্গে কারা কথা বলেছেন, সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। প্রথমে দু-তিনজনের গলা, তারপর জনা ছয়েক এবং সবশেষে আট-দশজন কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

মামলার অভিযোগ কী ছিল

দিদারুলের কাছে মূলত জানতে চাওয়া হয় রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে। এই রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য, অর্থায়ন এবং বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সংস্রব আছে কি না, তা নিয়েই মূলত প্রশ্ন করা হয়। কখনো কখনো রাষ্ট্রচিন্তার সদস্যদের বিভিন্ন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। সবশেষ নির্বাচন নিয়ে তাঁর একজন সহযোদ্ধার দেওয়া পোস্ট সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় তিনি ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত কি না। রাষ্ট্রচিন্তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা–ও জানতে চান প্রশ্নকর্তারা। ২০১৮ সালের কোনো এক সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে দু-একবার তাঁর সঙ্গে মোস্তাক আহম্মেদের কথা হয়েছিল। কী প্রসঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁকে বলতে বলেন প্রশ্নকর্তারা। তিনি মনে করতে পারেননি।

দিদারুল বলেন, ‘আমার ধারণা, আমাকে ধরা হয়েছে রাষ্ট্রচিন্তার সদস্যদের ভয় দেখানোর জন্য। রাজনীতিতে যাঁরা আমার সহযোদ্ধা, তাঁদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর চাইছিলেন তাঁরা।’

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগ অসত্য। র‍্যাব সব সময় আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসামিদের কাছ থেকে তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করে। তারপর তাঁদের আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়।

কারামুক্তির পর দিদারুল নতুন এক সমস্যায় পড়েছেন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর মুঠোফোন, ল্যাপটপ নিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাঁর পাসওয়ার্ডও জেনে নেন। এখনো কোনো ডিভাইস তিনি ফেরত পাননি। কিন্তু কারামুক্ত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লগইন করতে গিয়ে দেখেছেন পাসওয়ার্ড বদলে গেছে। নতুনভাবে ফেসবুকে ঢোকার অনুমতি পেয়ে দেখতে পান, তাঁর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কে বা কারা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছে। কখনো হুমকি দিয়েছে, কখনো মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছে। এখন তাঁর করণীয় কী, বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, অনেকেই সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারকে জিডি করতে যথেষ্ট হয়রানি পোহাতে হয়েছে। তিনি জিডি করলেও প্রতিকার পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন।

এদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ৫ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। গত ৭ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তবে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
ছয় মাস পরও জামিন হলো না কিশোর ও মোস্তাকের
কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের ভাই আহসানুল কবির প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তাঁর ভাই গত ছয় মাসে দুই দফা কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস তাঁকে ভোগাচ্ছে, ডান কানে শুনতে পাচ্ছেন না। তিনি বুঝতে পারছেন না, ঠিক কী কারণে তাঁর ভাইকে এতগুলো মাস আটকে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে মোস্তাক আহম্মেদের স্ত্রী লিপা আক্তার বলেন, তাঁর স্বামীর অপরাধ ঠিক কতটা গুরুতর, তা তাঁর বোধগম্য নয়। জামিন একজন মানুষের আইনগত অধিকার হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিম্ন আদালতে তাঁরা তিনবার জামিন আবেদন করেন, প্রতিবারেই তা নাকচ হয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তাঁরা হাইকোর্টে যান। রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সময় নেওয়ায় তাঁদের ভুগতে হচ্ছে। তাঁর স্বামী এখনো কাশিমপুর কারাগারে আছেন।
গত ৩ মে দিবাগত রাতে স্ত্রী লিপা আক্তারই প্রথম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানান, ‘মোস্তাককে র‍্যাব–৩–এর লোক এসে বাসা থেকে নিয়ে গেছে। সঙ্গে ওর সিপিইউ নিয়ে গেছে।’ একই দিনে র‍্যাব-৩ নিয়ে যায় আহমেদ কবির কিশোরকে। পরদিন দিদারুল ভূঁইয়া ও মিনহাজ মান্নান আটক হন। আহমেদ কবির কিশোর ও মোস্তাক আহম্মেদকে ৫ মে এবং দিদারুল ভূঁইয়া ও মিনহাজ মান্নানকে ৬ মে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলার এজাহারে র‌্যাব-৩ উল্লেখ করে, আই অ্যাম বাংলাদেশি (ইংরেজি হরফে লেখা) পেজ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মহামারি সম্পর্কে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তাঁদের উদ্দেশ্য রাষ্ট্র/সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো। মিথ্যা জেনেও তাঁরা গুজবসহ বিভিন্ন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছিলেন। আসামি করা হয় ওই পেজের ৫ জন অ্যাডমিনসহ ১১ জনকে।

কিশোর ও মোস্তাকের আইনজীবী জেড আই খান পান্না প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে দুইবার সময় নিয়েছে। জামিন আবেদনের শুনানি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তিনি আশাবাদী এবার তাঁদের জামিন হবে।

এই মামলার তদন্ত করছে রমনা থানা। এখন পর্যন্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বদল হয়েছে তিনবার। পুলিশ দুই দফায় তাঁদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করে। রমনা থানার তদন্ত কর্মকর্তা কাজল চক্রবর্তীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর আগে মামলাটির তদন্ত করছিলেন বিপ্লব বিশ্বাস। তিনিও কথা বলতে চাননি। সম্প্রতি মামলাটির তদন্ত ভার দেওয়া হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)।

মন্তব্য পড়ুন 0