default-image

অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) উত্তম কুমার বড়ুয়াকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে পুনরায় আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওএসডি রাখার কথা বরা হয়েছে। এর আগে গত ৩০ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক তদন্তে বের হয়ে আসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিন ধরনের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া দাম অনুসরণ না করে ও বাজারদর যাচাই না করে বেশি দামে এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

উত্তম কুমার বড়ুয়া আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপের যুগ্ম মহাসচিব।

বিজ্ঞাপন

অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঔষধ প্রশাসন অনুবিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্ব তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ বছরের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রায় ৯ মাস পর পরিচালককে ওএসডি করা হলো।

তদন্ত কমিটি জানায়, এর আগে উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে এমআর মেশিন কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। কমিটি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছে, আর্থিক অনিয়ম প্রকাশের পর সাজা পাওয়া একজন কর্মকর্তাকে দেশের স্বনামধন্য একটি হাসপাতালের পরিচালকের পদে বহাল রাখা ঠিক কি না, তা বিবেচনার দাবি রাখে। এ ছাড়া তাঁকে এ ধরনের ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম করার সুযোগ দেওয়াও ঠিক হয়নি।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তম কুমার বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার হাতে এখনো এমন কোনো চিঠি আসেনি। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য নয়। তবে আমি এটুকু বলতে পারি, আমি যা করেছি, তা সরকারি ক্রয় বিধিমালা মেনে করেছি। এসব কেনাকাটার বিষয়েই মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন ও মৌখিক নির্দেশ ছিল।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মোট আটটি ওটি লাইট ৬ কেটি ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। প্রতিটি লাইটের দাম পড়েছে ৭৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে, যা বাজারমূল্যের চেয়ে ২৫৬ শতাংশ বেশি। এতে সরকারের ৪ কোটি ৫৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

একই ওটি লাইট রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকায় এবং চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায়, স্যার সলিমউল্লাহ মেডিকেল কলেজে ২৩ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ‘হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট’ কর্মসূচির আওতায় এসব লাইটের প্রতিটির মূল্য ২২ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।শহীদ সোহরাওয়ার্দীতে ওটি লাইটের চাহিদা ২০টি। ক্রয় পরিকল্পনায় এমনটাই বলা আছে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশি দামে আটটি লাইট কেনে। এর মধ্যে দুটি লাইট কেনা হয় আরসিএস এন্টারপ্রাইজ থেকে।এ ছাড়া দুটি ‘কোবলেশন মেশিন’ কেনা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায়। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে মূল্যতালিকা অনুমোদন করা হয়েছে, সেখানে এর মূল্য ধরা হয়েছে প্রতিটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুটির দাম সর্বোচ্চ ৩২ লাখ টাকা। ফলে সরকারের ৭৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া মেশিনের চাহিদা রয়েছে ১৫টি। এএসএল নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ভেন্টিলেশনসহ দুটি অ্যানেসথেসিয়া মেশিন ১ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কেনা হয়। অর্থাৎ একটির দাম পড়েছে ৫৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সিয়াপসের কর্মসূচির সহায়তায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে মূল্য নির্ধারণ করেছে, সেখানে প্রতিটি মেশিনের মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৬০০ টাকা। সে হিসেবে দুটির দাম সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ২০০ টাকা হওয়ার কথা। এ মেশিন কিনে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

তদন্ত প্রতিবেদনে আর্থিক অনিয়ম করে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের জন্য হাসপাতাল পরিচালক উত্তম কুমার বড়ুয়া, বাজারদর কমিটির সদস্য নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৌমিত্র সরকার, নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান রতন দাশ গুপ্ত, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এ এস এম কামরুজ্জামান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

মন্তব্য পড়ুন 0