বিজ্ঞাপন

প্রকল্পটির অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে ২ জানুয়ারি প্রথম আলোয় ‘দুর্নীতিতে লেজেগোবরে মাল্টিমিডিয়া প্রকল্প’ শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদন ছাপা হয়।

প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল চার বছর। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় করোনার কারণে অন্য প্রকল্পের সঙ্গে এই প্রকল্পের মেয়াদ আরেক বছর বাড়ানো হয়েছে। তারও ছয় মাস পার হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারি তদন্ত বলছে, সাড়ে চার বছরেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ হয়নি এই প্রকল্প থেকে। ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (দ্বিতীয় পর্যায়ে)’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। আগামী জুনে শেষ হচ্ছে প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ।

এ প্রকল্পের দুর্নীতির তদন্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ)। এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, দেশের ২০ জায়গায় প্রশিক্ষণ হয়েছে। প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. আব্দুস সবুর খান সেখানে উপস্থিত না হয়েও ‘প্রোগ্রাম পরিচালক’ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন স্বাক্ষরে সাড়ে তিন মাসে প্রায় ১৭ লাখ টাকা সম্মানী নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ–সংশ্লিষ্ট আরও অনেকেই এভাবে সম্মানীর নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ক্রয়প্রক্রিয়া শুরুর আগেই পৌনে ১ কোটি টাকার প্রশিক্ষণসামগ্রী গ্রহণ করা হয়েছে বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। কোনো প্রকার দরপত্র বা ক্রয়বিধি ছাড়াই সোয়া ২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। নিয়ম ভেঙে ব্যয় করা হয়েছে আরও প্রায় ২১ লাখ টাকা।
মাউশির সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। মোট ১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ–সংক্রান্ত উপকরণ কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫৫ কোটি টাকা। আর প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩১ কোটি টাকা। বাকি টাকা অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়ের জন্য ধরা হয়েছে।

মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ করার জন্য চার ধরনের উপকরণ কেনার কথা। এগুলো হলো ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর (স্কিনসহ), ইন্টারনেট মডেম ও স্পিকার। এই চারটি মিলে একটি সেট। মোট ৪৬ হাজার ৪৪৫ সেট উপকরণ কেনার কথা। কারণ, প্রকল্পে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক সেট উপকরণ দেওয়ার প্রস্তাব আছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে এক সেট উপকরণও যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে ১৩ হাজার ৫৭৪টি ইন্টারনেট মডেম পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ল্যাপটপসহ অন্যান্য উপকরণ না দেওয়ায় এই মডেমগুলো ব্যবহারের সুযোগ নেই।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান প্রকল্প পরিচালকের যোগ দেওয়ার আগে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের উপকরণ কেনাকাটার জন্য দরপত্রের কাজও শেষ হয়েছিল। কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে উপকরণ কেনাকাটা বন্ধ করা হয় মাউশি ও প্রকল্প সূত্র জানায়। এ নিয়ে একটি মামলাও চলমান। তখন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর বর্তমান প্রকল্প পরিচালক আবদুস সবুর খানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন মূল কাজ কিছুই করতে পারেননি। হয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতি।

মাউশি সূত্রে জানা গেছে, শুধু ডিআইএ নয়, তার আগে মাউশির একজন পরিচালকের নেতৃত্বে হওয়া তদন্তেও এই প্রকল্পে অনিয়মের সত্যতা মিলে। প্রকল্পের অনিয়ম এখন দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত করছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন কয়েক দিন আগে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তাঁদের নীতি হলো যাঁরাই অনিয়ম–দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এই প্রকল্পের জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

তখনই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছিল, আপাতত প্রকল্প পরিচালক আব্দুস সবুর খানকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন