বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘বিচার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই অভিপ্রায় জানাতে চাই যে বিচার বিভাগে কোনো দুষ্ট ক্ষতকে আমরা ন্যূনতম প্রশ্রয় দেব না। দুর্নীতি একটি ক্যানসার। কোনো আঙুলে যদি ক্যানসার হয়, সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে, আঙুলটি কেটে ফেলা। দুর্নীতির ব্যাপারে আমি কোনো কম্প্রোমাইজ করব না। চিহ্নিত হলে সঙ্গে সঙ্গে স্টাফ বা অফিসার যে-ই হোক না কেন, সাসপেন্ড করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সব শাখার অস্বচ্ছতা, অনিয়ম ও অযোগ্যতাকে নির্মূল করতে সবাইকে পাশে পাব—এই আশা ব্যক্ত করছি।’

মামলাজট নিরসন, বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-গতিশীলতা আনা ও অনিয়ম অনুসন্ধানে পৃথক কমিটি গঠন করার কথাও বলেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘দেশের সব অধস্তন আদালতে মামলাজট নিরসন ও বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে আটটি বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতিকে প্রধান করে একটি করে মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। প্রতি মাসে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিবেদন গ্রহণ করা হবে। পুরোনো মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপারভাইজ ও মনিটরিং করা হবে।’

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, সুপ্রিম কোর্টে, হাইকোর্ট বিভাগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য একটি প্রিলিমিনারি ইনকোয়ারি কমিটি গঠন করা হবে।

নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘বার ও বেঞ্চ হলো একটি পাখির দুটি ডানা। আর জুডিশিয়ারি হলো সমস্ত দেহ। পাখা দুটি সমানভাবে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই দেশের সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। বারের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই কোর্ট পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘বিচার বিভাগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যত দূর সম্ভব সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। যে জাতি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে জীবনকে বাজি রেখে তার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারে, সে জাতি বিচার বিভাগের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, এটি আমার বিশ্বাস হয় না। আমি বরাবর আশাবাদী মানুষ।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগে অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করলে সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারব ইনশা আল্লাহ। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটি অঙ্গ দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। এ কারণে আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের অপর দুটি বিভাগ তাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, মনে রাখতে হবে যে ন্যায়বিচার জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া জনগণের প্রতি দয়া নয়, বরং এটি তাদের সহজাত অধিকার। দেশের সব বিচারককে নিরপেক্ষতার সঙ্গে, নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে মানুষের ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির সহজাত অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বিচারকদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে, বিচারিক সময় ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতে প্রত্যেক বিচারককে মামলা নিষ্পত্তিতে অভূতপূর্ব অভিযাত্রায় অগ্রসেনানী হওয়ার এক ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ সমাজের একজন সাধারণ মানুষ। এই দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আবেগ-অনুভূতি ও আনন্দ-বিরহ মনের গভীর থেকে আমি উপলব্ধি করতে পারি। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার কোনো অশুভ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না।’

বিচার বিভাগকে নিয়ে আইনের কাঠামোর মধ্যে যেকোনো গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনাকে স্বাগত জানাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, আপনারা যাঁরা বিচার বিভাগের আলোচক ও সমালোচক বন্ধু রয়েছেন, তাঁরা বিচার বিভাগের সমস্যা উপলব্ধি করবেন, নিঃসংকোচে আলোচনা বা সমালোচনা করবেন—রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণকামিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে।

অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান বিচারপতির কর্মময় জীবন তুলে ধরে শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, কয়েক দিন আগে সুপ্রিম কোর্ট দিবসের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে রায় ঘোষণার পর এর অনুলিপি পাওয়ার জন্য বিচারপ্রার্থী জনগণের আদালতের বারান্দায় দীর্ঘ অপেক্ষার কথা বলেছিলেন। উন্মুক্ত আদালতে রায় ঘোষণার মাধ্যমে তা পক্ষগণ জানতে পারলেও ওই রায় স্বাক্ষরিত হয়ে বিচারপ্রার্থীর হাতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তা কার্যকর করা যায় না। তাই ঘোষিত রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি দ্রুত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করেন তিনি।

এরপর প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে সমিতির সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে একজন বিচারপ্রার্থীর সর্বশেষ আশাভরসার স্থল। সুতরাং এই অঙ্গনকে কলুষমুক্ত রাখা, দুর্নীতিমুক্ত রাখা সবার দায়িত্ব। ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা সদা সর্বদা সোচ্চার।’

কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস বলেন, জামিন প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে আদেশ নামানো, আদেশ ডেসপাচ করা প্রতিটি ক্ষেত্রেই অহেতুক নানাবিধ অতিরিক্ত পয়সা খরচ করতে হয়। অথচ আদালতে ফাইল আনা, ফাইল পাঠানো কিংবা আদেশ পাঠানো আইনগতভাবে অত্র আদালতের প্রশাসনিক দায়িত্ব। নবীন আইনজীবীরা এটিই যে নিয়ম সেটিই আজ ভুলতে বসেছেন। অনিয়ম এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে মনে হয় এসব প্রশাসনিক কাজ সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বা আইনজীবী সহকারীর দায়িত্ব। এ কারণে বিচার প্রশাসনে নানা রকম দুর্নীতি ও অনিয়ম ঘটছে। একটি মামলা অ্যাফিডেভিট করে দায়েরের পর আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে ও আদালতের আদেশের পর আদেশ পাঠানো পর্যন্ত পদে পদে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।

এসব সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকারভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ করার জন্য প্রধান বিচারপতির প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন