পদ্মা সেতুর মূল কাজের নির্মাণ শুরু ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে শেষ হওয়ার কথা ছিল চার বছরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হতে প্রায় সাড়ে সাত বছর লেগেছে। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি জটিলতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই সময় বেশি লেগেছে।

সেতু বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুসারে, নির্মাণকাজ শুরুর পর প্রকল্প এলাকায় ২০টির বেশি ঝড় বয়ে গেছে। এর মধ্যে ঘণ্টায় ৪৬ মাইল বেগে ঝড়ের ঘটনা বেশ কয়েকটি বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এমন ঝোড়ো পরিস্থিতিতে ভারী যন্ত্রের ব্যবহার একেবারে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ ছাড়া কুয়াশার কারণেও ভারী যন্ত্রের ব্যবহার করা যায়নি।

২০২০ সালের আগস্টে মাওয়ায় নির্মাণ মাঠের (কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড) একাংশ বন্যার ভাঙনে ভেসে যায়। এ সময় সেতুর যানবাহন চলাচলের পথ তৈরির ১২৫টি কংক্রিট স্ল্যাব এবং রেলপথের স্টিলের ৬৮টি বিম বা স্ট্রিনজার ভেসে যায়। চেষ্টা করেও এগুলো আর উদ্ধার করা যায়নি। স্ল্যাবগুলো পরে মাওয়ার নির্মাণ মাঠে তৈরি করা হয়। কিন্তু রেলের স্ট্রিনজারগুলো নতুন করে লুক্সেমবার্গ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে প্রায় পাঁচ মাস সময় লেগে যায়।

মাটির নিচে স্টিল ও রডের ২৯৪টি পাইল বসাতে হয়েছে। এই কাজের জন্য আধুনিক পাঁচ সেট হাইড্রোলিক হ্যামার বা হাতুড়ি বিদেশ থেকে আনা হয়েছিল। এর মধ্যে পাইলিং করতে গিয়ে তিন সেট হাতুড়ি বিকল হয়। দুই সেট হাতুড়ি পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে জার্মানি থেকে উচ্চ ক্ষমতার তিনটি হাতুড়ি আনা হয়।

ভরা বর্ষায় নদীর পানির স্রোতের বেগ থাকে সেকেন্ডে ৪ দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত। এমন স্রোতে নদীশাসনের কাজ ব্যাহত হয়। সেতুর পিলারের ওপর ক্রেন দিয়ে ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের স্টিল বা ইস্পাতের স্প্যান বসানো হয়েছে। এসব স্প্যানবাহী ক্রেনগুলো আবার ভাসমান নৌযানে করে নির্মাণ মাঠ থেকে পিলারের গোড়ায় নিতে হয়েছে। অত্যধিক স্রোতে ভাসমান নৌযান ঠিকমতো দাঁড়াতে পারে না। আর নৌযান নড়াচড়া করলে স্প্যান ওঠানো যায় না। এ জন্য পরিকল্পনামতো অনেক স্প্যান বসানো যায়নি।

বর্ষায় স্রোত যেমন সমস্যা, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পলি জমা আরেক সমস্যা। এর ফলে নাব্যতা–সংকট দেখা দেয়। এতে সেতুর কাজের নৌযান চলতে পারত না। কখনো কখনো নদীর তলদেশে ৩০-৪০ ফুট পর্যন্ত পলি জমে যায়। নদীর গতিধারা পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে।

করোনা মহামারির কারণে দুই বছর পুরোপুরি বিধিনিষেধে থাকতে হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের কর্মীদের একটা বড় অংশ ছিলেন বিদেশি নাগরিক। করোনা মহামারির সময় প্রকল্প এলাকায় ‘এয়ার বাবল’ তৈরি করে কাজ করতে হয়েছে। নয়তো বিদেশিরা কাজ করতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন।

এ জন্য বাংলাদেশি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও কর্মীদের প্রকল্প এলাকার ভেতরে থাকতে হয়েছে। তাঁরা ছুটি পাননি। আর একবার কেউ ছুটিতে যেতে চাইলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ) করে আবার কাজে যোগ দিতে হয়েছে। এ জন্য বেশির ভাগ কর্মী ও কর্মকর্তা দীর্ঘদিন প্রকল্প এলাকার বাইরে যাননি।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেছেন। এর মধ্যে চীনের ৭০০ এবং বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার মানুষ কাজ করেছেন। ১৬০টির মতো স্থানীয় সহযোগী ঠিকাদার হিসেবে বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করেছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন