দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে হৃদ্‌রোগে। বিভিন্ন রোগ ও দুর্ঘটনায় বছরে আট লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এক বৈশ্বিক প্রাক্কলনে বলা হচ্ছে, ২০৪০ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ১১ লাখ ২৩ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হবে ক্যানসারে।

ওই বৈশ্বিক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল হৃদ্‌রোগে। মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে স্ট্রোক ও ক্যানসার। মৃত্যুর প্রধান ১০ কারণের তালিকায় থাকা অন্য রোগ ও কারণগুলো হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ (সিওপিডি), নবজাতকের মৃত্যু, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়াবেটিস, ডায়রিয়াজনিত রোগ, সড়ক দুর্ঘটনা ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ। বৈশ্বিক প্রাক্কলনে বলা হচ্ছে, ২০৪০ সাল নাগাদ নবজাতকের মৃত্যু ও নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে মৃত্যু কমবে, বাকি সাতটি রোগ ও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু বাড়বে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হবে ক্যানসারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশনের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ৩৮ জন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক বিশ্বের ১৯৫টি দেশের গড় আয়ু, বর্তমানে মৃত্যুর কারণ এবং ভবিষ্যতে কোন রোগে বেশি মৃত্যু হবে, তার পূর্বাভাস দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ২৫০টি রোগ ও বিভিন্ন ধরনের জখমকে মৃত্যুর কারণ নির্বাচিত করেছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী সম্প্রতি ৩ হাজার ৭০০ পৃষ্ঠার গবেষণা তথ্য প্রকাশ করেছে।

বর্তমান সরকার ২০৪১ সাল ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করছে। তার সঙ্গে সংগতি রেখে স্বাস্থ্য খাতেও কিছু পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, সব স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতে সরকার বরাদ্দ আরও বেশি দেবে। ঢালাও বরাদ্দের পরিবর্তে বিভিন্ন উপখাতে প্রয়োজনমাফিক বরাদ্দ দেওয়া হবে। পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তনের মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষের মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি
বাংলাদেশে কোন রোগে বা দুর্ঘটনায় বছরে কত মানুষের মৃত্যু হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কোনো দপ্তরে নেই। এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম এইডসে মৃত্যু। প্রতিবছর ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসে সরকার এক বছরে এইডসে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। আর কোনো মৃত্যু নিয়ে সরকারের কোনো দপ্তর থেকে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায় না। তবে সরকারের জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) গবেষকেরা বলেছেন, রোগ ও বিভিন্ন কারণে দেশে বছরে আনুমানিক আট লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশনের হিসাবে বলা হচ্ছে, ২৫০টি রোগ ও বিভিন্ন ধরনের জখমে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ২০৪০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১১ লাখ ২৩ হাজার ৪৫০ হবে। অর্থাৎ মৃত্যু বাড়বে ৩২ শতাংশ।

গবেষকেরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী রোগের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমে আসছে। তবে অসংক্রামক রোগের (ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ) প্রকোপ ও এতে মৃত্যু বাড়ছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৭০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ ছিল অসংক্রামক রোগ। ২০৪০ সালে তা বেড়ে ৮০ শতাংশ হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিষয়ভিত্তিক পরিচালক নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, অসংক্রামক রোগ শনাক্ত করার জন্য কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশ কিছু ওষুধ বিনা মূল্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব রোগ প্রতিরোধ করার জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণার কাজেও হাত দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

অপ্রতিরোধ্য ক্যানসার
গবেষকেরা ৩৮ ধরনের ক্যানসারে মানুষের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছেন। সব ধরনের ক্যানসারে বাংলাদেশে ২০১৬ সালে মোট ৮৯ হাজার ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০৪০ সালে ক্যানসারে মৃত্যু বেড়ে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪০ হবে। অর্থাৎ ক্যানসারে মৃত্যু বাড়বে ৯০ শতাংশ। ৩৮ ধরনের ক্যানসারের মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিস্তারিতভাবে এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

গত মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্যানসার পরিস্থিতির বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছিল, বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ মানুষ ক্যানসারে মারা যাচ্ছে। আর প্রতিবছর নতুন করে দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে।

তবে ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসারের প্রকোপের তুলনায় দেশে এর প্রতিরোধ উদ্যোগ ও চিকিৎসার আয়োজন কম। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান হাবিবুল্লাহ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, মানুষকে সচেতন করে ক্যানসারের প্রকোপ কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে উদ্যোগের পাশাপাশি সম্পদ বরাদ্দ কম।

ঝুঁকি
বেশ কিছু ঝুঁকি বিশ্বের দেশগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাবে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। প্রতিটি দেশের জন্য প্রধান ১০টি ঝুঁকিকে তাঁরা গবেষণা দলিলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের ঝুঁকির তালিকার শীর্ষে আছে ধূমপান। উচ্চ রক্তচাপ দ্বিতীয় স্থানে।

বিশুদ্ধ বায়ু বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। ঝুঁকির তালিকার তৃতীয় স্থানে আছে গৃহ অভ্যন্তরের বায়ুদূষণ এবং চতুর্থ স্থানে আছে বায়ুতে ভাসমান ধূলিকণা। পঞ্চম কারণ রক্তে শর্করা বৃদ্ধি।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশনের গবেষণাকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অভিজ্ঞতার আলোকে রোগের প্রকোপ ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একটি কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই গবেষণা হয়েছে। এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এর মর্মকথা উপলব্ধি করা এবং সুপারিশ কাজে লাগানো।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন