প্রথম আলো: কোভিড-১৯-এর কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে অভিঘাত তৈরি করেছিল, তা মোকাবিলায় সরকার কমবেশি সফল। কিন্তু আপনারা ‘দলীয় কোভিড’ মোকাবিলা করতে পারলেন না কেন? সিলেটের পর নোয়াখালী, সবশেষ ঢাকার সাংসদ হাজি সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিমের ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেবেন?

হাছান মাহমুদ: সিলেটের এম সি কলেজের ঘটনায় আমাদের দলের কেউ জড়িত নন, নোয়াখালীতেও না। এঁরা হচ্ছেন মাস্তানজাতীয় লোক। ১২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে যাঁরা সমাজের সুবিধাবাদী, তাঁদের অনেকে দলের নাম ব্যবহারের চেষ্টা করেন। সব উন্নয়নশীল দেশে এটি হয়ে থাকে। এঁরা আমাদের দলের কোনো পদে নেই। আমাদের দলের নীতি হচ্ছে, এসব অপরাধ যাঁরা করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার। এ ক্ষেত্রে কে কোন দলের, দেখা হচ্ছে না। যেসব আগাছা রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তৃণমূল পর্যন্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, যাঁরা সুবিধাবাদী এবং দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে চান, তাঁদের তালিকা পাঠাতে। একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরিও হয়েছে।

গত বছর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যতগুলো অভিযান হয়েছে, সবখানেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ধরা পড়েছেন। নোয়াখালীর নারী নিগ্রহের ঘটনায় সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আইন করার সুপারিশ করেছে। আপনারা কি তা করবেন?

হাছান মাহমুদ: তদন্ত কমিটি পর্যবেক্ষণ দিতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি দেশে যেসব আইন আছে, সেগুলো যেকোনো অপরাধের শাস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শাস্তি হচ্ছেও।

আওয়ামী লীগ থেকে বলা হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা দলে অনুপ্রবেশ করে অপরাধ সংঘটিত করছেন। এমনকি ফ্রিডম পার্টির লোকও ঢুকেছেন বলে অভিযোগ আছে। তাঁরা ঢুকলেন কীভাবে?

হাছান মাহমুদ: এ রকম খুব বেশি হয়েছে, তা নয়। তবে একটিও হওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে জামায়াত ও ফ্রিডম পার্টির কাউকে দলে জায়গা দেওয়ার কথা নয়। তারপরও যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাংসদ হাজি সেলিমও তো বিএনপি থেকে এসেছেন। তিনি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে হারিয়ে সাংসদ হয়েছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করেছেন। তারপরও তাঁকে দলে গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর নানা অপকীর্তি এখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।

হাছান মাহমুদ: দলের শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে যাঁরা নির্বাচন করেছিলেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি। যাঁদের দলে নেওয়া হয়েছে, হাজি সেলিম তাঁদের মধ্যে একজন। গণমাধ্যমেই দেখেছি, অগ্রণী ব্যাংকের জমি তাঁর দখলে ছিল। সোনারগাঁয়ে সরকারি জমিও তাঁর দখলে ছিল, যা উদ্ধারে ইতিমধ্যে অভিযান চালানো হয়েছে। সাংসদ কেন, কোনো জনপ্রতিনিধিরই এ ধরনের কাজে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত নয়। সরকারি বা বেসরকারি জমি দখল তো ফৌজদারি অপরাধ। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

সম্প্রতি রিপোর্টার্স ইউনিটির সমাবেশে আপনি সাংবাদিকদের প্রতি সরকারের খারাপ কাজের সমালোচনার পাশাপাশি ভালো কাজের প্রশংসা করতে বলেছেন। কিন্তু সরকারের সমালোচনা করার জন্য তো অনেক গণমাধ্যমকে শাস্তি পেতে হয়েছে।

হাছান মাহমুদ: আমরা মনে করি, ক্ষমতায় থাকলে সমালোচনা হবে। যার কাছে ক্ষমতা বা দায়িত্ব আছে, তার সমালোচনা হবে। সমালোচনাকে সমাদৃত করার সংস্কৃতিটা তৈরি হওয়া দরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমালোচনা সমাদৃত করেন, তাঁর সরকারও করে। কিন্তু অনেক সময় অযাচিত সমালোচনা হয়। অসত্য খবর প্রচার করা হয়, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

আপনারা বলেন বিএনপির জনসমর্থন নেই। আবার প্রায় প্রতিদিনই বিএনপিকে নিয়ে কথা বলেন। এর কারণ কী?

হাছান মাহমুদ: প্রথমত বিএনপির কোনো জনসমর্থন নেই, এ কথা আমরা বলি না। তবে বিএনপির জনসমর্থন আগের জায়গায় নেই। রাজনীতিতে আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিই। তারা যখন আমাদের সম্পর্কে বিষোদ্‌গার করে, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়, সেসবের জবাব তো আমাদের দিতেই হবে।

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। পরবর্তীকালে তাদের সঙ্গে সরকারকে সখ্য গড়ে তুলতেও দেখলাম।

হাছান মাহমুদ: হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয়। কওমি মাদ্রাসাওয়ালাদের একটি প্ল্যাটফর্ম। হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে এসেছে। কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতিসহ অনেক দাবি পূরণ হয়েছে। এর মাধ্যমে কওমি শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হলো। আমি মনে করি, এটি সরকারের সাফল্য। যে চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, সেই চেতনাই আমরা এগিয়ে নিয়ে চলেছি। আমরা নীতির পরিবর্তন করিনি। তবে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে অনেকে তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে।

আপনি বলেছেন, সরকার নীতি পরিবর্তন করেনি। তাহলে হেফাজতের দাবি মেনে আপনারা কেন পাঠ্যবইয়ে রদবদল আনলেন?

হাছান মাহমুদ: হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যবইয়ে রদবদল করা হয়নি। পাঠ্যবইয়ে কিছু অসংগতি ছিল। সেগুলো সরকারের নজরে এসেছে এবং তা সংশোধন করা হয়েছে।

করোনাকালে গণমাধ্যমের সংকট উত্তরণে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে গণমাধ্যমের পাওনা বকেয়া আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কতটা সফল হয়েছে?

হাছান মাহমুদ: তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পাওনা পুরোটাই পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় যে বকেয়া ছিল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে দু-দুবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের কারণেই পত্রপত্রিকাগুলো সচল আছে। এ ছাড়া আর্থিক সংকটে থাকা সাংবাদিকদেরও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

দেশে অবাধ তথ্যপ্রবাহ থাকা উচিত। সরকার এই লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইনও করেছিল। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেই তথ্য পাওয়ার অধিকারকে গুরুতরভাবে খর্ব করেছে। এ আইন করার সময় বলা হয়েছিল, এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। অথচ হরহামেশা ব্যবহার করা হচ্ছে।

হাছান মাহমুদ: বাংলাদেশে যে অবাধ তথ্যপ্রবাহ আছে, উন্নত দেশেও তা নেই। ভুল সংবাদ বা অসত্য সংবাদ পরিবেশন করার জন্য গত ১০ বছর কোনো পত্রিকা বন্ধ হয়নি। জরিমানা গুনতে হয়নি। ইউরোপ ও আমেরিকায় জরিমানা দিতে হয়। ইংল্যান্ডের ১৬৮ বছরের পুরোনো নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড বন্ধ হয়ে গেছে একটি অসত্য খবর প্রকাশের কারণে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। একই ধরনের আইন ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় করা হয়েছে। কেউ যদি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন সাংবাদিকের চরিত্র হনন করে, এ আইন ছাড়া তিনি প্রতিকার পাবেন কীভাবে।

কিন্তু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ আইনের অপব্যবহার হচ্ছে।

হাছান মাহমুদ: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, সরকার নজরদারি করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমিও নজরে রাখছি।

সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সংখ্যা দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিরূপিত হয় না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন জারির পর রীতিমতো ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

হাছান মাহমুদ: আমি মনে করি, বাংলাদেশে ভয়ের পরিবেশ নেই। অবাধে সবকিছু লেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে গণমাধ্যম যতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, অনেক পশ্চিমা দেশেও তা হয় না।

আপনারা বলছেন, সরকার কোনো অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছে না। কিন্তু দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় যাতে অপরাধ সংঘটিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

হাছান মাহমুদ: এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এগোচ্ছেন। সরকার যদি দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দিত, তাহলে এভাবে তারা ধরা পড়ত না। যেখানেই অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে, সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। দুর্নীতি দমনের এটাই কার্যকর পথ।

দেশে তো একটা রাজনৈতিক সংকট চলছে। উত্তরণের উপায় কী?

হাছান মাহমুদ: দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই। সংকট আছে বিএনপির মধ্যে। আওয়ামী লীগ একটি গণসংগঠন। নানা ধরনের লোকের সমাবেশ ঘটেছে। আমরা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছি। সাংসদ হাজি সেলিমের পুত্রের ক্ষেত্রে যে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, বিএনপির সময়ে কি তা হতো? প্রকাশ্য রাজপথে একজন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে যেভাবে মারধর করা হলো, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা। কিন্তু এগুলোকে তো রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

হাছান মাহমুদ: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0