বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রুপেনার কোলে ছিল দেড় বছর বয়সী টুম্পা। টুম্পাকে নিয়ে সাঁতার কেটে পাড়ে যেতে পারছিলেন না তিনি। সামনে একগুচ্ছ কচুরিপানা পেয়ে টুম্পাকে তার ওপর বসিয়ে দেন এই মা। এরপর ওই কচুরিপানা ঠেলতে ঠেলতে তীরে চলে আসেন তিনি। রুপেনার স্বামী মো. হোসাইনও সাঁতরে তীরে উঠে আসেন। তবে নিখোঁজ হয় তাঁদের অপর দুই সন্তান আলমিনা (৮) ও ফারহা মনি (৬)। দুপুরের পর নদী থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আলমিনা ও ফারহা মনির লাশ উদ্ধার করেন। সন্তানের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মো. হোসাইন। বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা রুপেনা বেগম।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, গতকাল ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ডুবে যাওয়া ওই নৌকায় মোট ১৮ জন যাত্রী ছিলেন। নৌকাডুবিতে তাঁদের মধ্যে পাঁচ শিশুসহ সাতজন নিখোঁজ হন। শনিবার বিকেল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা অভিযান চালিয়ে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করেন। আলমিনা ও ফারহা দুই ভাইবোনের পাশাপাশি মৃত অপর তিনজনও আরেকটি পরিবারের সদস্য। তাঁরা হলেন সোয়ালা বেগম (২৬), তাঁর ছেলে এমরান হোসেন (৫) ও ভাগনে মো. আরমান (৭)। এখনো যে দুজন নিখোঁজ আছেন, তাঁরা হলেন আরমানের মা রূপায়ণ বেগম (৩৫) এবং তাঁর দুই বছরের মেয়ে জেসমিন বেগম।

আমিনবাজার নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর শেখ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, একটি বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নৌকাটি ডুবে যায়। ঘটনার পর বাল্কহেডটি পালিয়ে যায়। সেটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। নৌকাটির চালককেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় দুর্ঘটনাজনিত অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকেও মামলার দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

এ ঘটনায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক ফজলুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় আমিনবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক নারী ও চার শিশুর লাশ পাশাপাশি রাখা হয়েছে। পাশেই বিলাপ করছিলেন স্বজনেরা। সেখানে কথা হয় মৃত সোয়ালার স্বামী কাবিল হোসেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার গজারিয়া গ্রামে। সেখানে তিনি অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু বড় ছেলের অসুস্থতা এবং সংসার চালাতে কষ্ট হওয়ায় তাঁরা বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এ কারণে কয়লাশ্রমিকের কাজ করতে সাভারের আমিনবাজারে আসেন। তাঁর কখনোই মনে হয়নি, কাজের জন্য এসে এভাবে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ নিয়ে ফিরতে হবে।

স্বজনেরা জানান, রূপায়ণ ও তাঁর স্বামী শফিকুলও সংসারের অভাব ঘোচাতে এক মাস আগে সুনামগঞ্জ থেকে আমিনবাজারে এসেছিলেন। তাঁরা প্রতিবছর সেপ্টেম্বরে কাজের সন্ধানে আসেন এবং ছয় মাস পর গ্রামে ফিরে যান। তবে রূপায়ণের বোন সোয়ালা এবং তাঁর স্বামী কাবিল এবারই প্রথম আমিনবাজারে কাজ করতে এসেছিলেন।
আজও উদ্ধার অভিযান

নৌকাডুবির খবর পেয়ে সকালেই ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের তিনটি ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। উদ্ধার অভিযানে তাদের সঙ্গে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএর সদস্যরা অংশ নেন। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এ অভিযানে চার শিশু ও একজন নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বেলা তিনটার দিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ডুবে যাওয়া নৌকাটি ক্রেনের সাহায্যে নদীর ১১০ ফুট গভীর থেকে তুলে আনে।

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দিনমনি শর্মা প্রথম আলোকে বলেন, যে দুজন নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের উদ্ধারে আজ সকাল থেকে অভিযান শুরু হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন