বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ মার্কিন দূত হিসেবে এটি বাংলাদেশে আপনার প্রথম সফর। এ সফরের উদ্দেশ্য কী ছিল?

রাশাদ হুসেইন: এ বছর দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্‌যাপন করছে। এ উপলক্ষে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে এ সফর। মানবাধিকার সুরক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সফরে ধর্মীয় নেতাদের, সরকারের প্রতিনিধিদের এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছি।

প্রথম আলো: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আপনি মতবিনিময় করেছেন। বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে তাঁরা আপনাকে কী জানিয়েছেন? এসব আলোচনার পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?

রাশাদ হুসেইন: বাংলাদেশে আমার প্রথম সফরটা দারুণ হয়েছে। এখানকার লোকজন কীভাবে পবিত্র রোজার মাস পালন করে, সেটা দেখার সুযোগ হয়েছে। এই সফরে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আমি মতবিনিময় করেছি। তাঁরা বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশে ধর্মীয় সহমর্মিতার ঐতিহ্যের বিষয়ে আমার যে ধারণা ছিল, এ সফরে এসে তা আরও প্রবল হয়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে কোনো সংকট তৈরি হলে সব সম্প্রদায়ের মানুষ তা প্রতিহত করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। এখানে কেউ যাতে বিভাজন সৃষ্টি বা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে সফলকাম না হয়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যে সচেষ্ট, সেই বার্তা পেয়েছি।

প্রথম আলো: বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চার ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের উদ্বেগের কোনো বিষয় এখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কি আলোচনায় তুলেছেন?

রাশাদ হুসেইন: বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে নিরাপদ আছেন বলে বিশ্বাস করি। তবে সত্যিকার পরীক্ষাটা হচ্ছে সামনে যখন কোনো চ্যালেঞ্জ আসে, তা প্রতিহত করার জন্য জনগণ ও সরকার কীভাবে এগিয়ে আসে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের পাশাপাশি সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভালো করার জন্য দুই দেশের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন আছে।

প্রথম আলো: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রাশাদ হুসেইন: সব সম্প্রদায়ের মানুষ যেন অবাধে ধর্ম চর্চা করতে পারেন, এ বার্তাই আমরা সব দেশকে দিয়ে থাকি। কোনো সম্প্রদায়ের মানুষই যেন নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে হামলার শিকার না হন। এমনকি যদি কেউ ধর্মে বিশ্বাস না করেন, তাঁরাও যেন হামলার শিকার না হন। কারও প্রতি কোনো ধরনের হামলা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ সব দেশের জন্য এটাই আমাদের বার্তা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যেন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারেন, কোনো সংকট দেখা দিলে সবাই যাতে একসঙ্গে এগিয়ে এসে তা রুখে দিতে পারেন, সে জন্য আমরা সবাইকে উৎসাহিত করি।

প্রথম আলো: প্রতিবছর ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের পর্যবেক্ষণ থাকলে তা সামনে আনেন। আপনাদের এসব মতামতকে সরকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে। এ নিয়ে কী বলবেন?

রাশাদ হুসেইন: যেকোনো বিষয়ে একে অন্যের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে গভীর বন্ধুত্বের একটি অংশ। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের চমৎকার আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটা হচ্ছে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি চ্যালেঞ্জ থাকলে তা মোকাবিলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছরের অক্টোবরের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিষয়টি। ওই সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেশ জোরালোভাবে মুসলমান এবং হিন্দুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক মার্কিন বার্ষিক প্রতিবেদনে সবার অবাধে ও স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে।

প্রথম আলো: বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঘটনা ঘটলে ভারতে এর প্রভাব পড়ে। আবার ভারতে কিছু ঘটলে তার প্রভাব দেখতে পায় বাংলাদেশ। এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনাগুলোকে কীভাবে দেখেন?

রাশাদ হুসেইন: বাংলাদেশ সফরের উৎসাহব্যঞ্জক দিক হচ্ছে, লোকজন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন। গাজীপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মতবিনিময়ের সময় স্পষ্ট করেই বলেছেন, মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের মধ্যে বিভাজন আর সংঘাত সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কাউকে এ ঐতিহ্য নষ্ট করতে দেবেন না। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাব।

প্রথম আলো: মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পাঁচ বছর পার হতে চললেও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো অগ্রগতি নেই। মিয়ানমারের গত বছরের ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিনিয়ত অবনতি হচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে এ সংকটের সমাধান কোথায়?

রাশাদ হুসেইন: মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ঘোষণা করেছে। আমরা এ গণহত্যার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অব্যাহতভাবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকাসহ মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশা জাগিয়ে রাখতে হবে। তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জীবনে যা ঘটেছে, তা একদিকে হৃদয়বিদারক আবার নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য তাদের যে চেষ্টা, সেটাও উল্লেখ করার মতো। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহতভাবে তাদের পাশে থাকাটা জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন