সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে একযোগে তৎপর হয়ে উঠেছে হেফাজতে ইসলামসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো। আলাদা অবস্থানে থেকে কর্মসূচি দিলেও এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। ভাস্কর্যটি না সরালে মাঠে নামার হুমকি দিয়ে রেখেছে হেফাজত।

পাঠ্যবই থেকে নামকরা কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের কিছু গল্প-কবিতা বাদ দেওয়া নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই গত মাসে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানোর দাবি তোলে ইসলামপন্থী দলগুলো। তারা ভাস্কর্যটিকে ‘গ্রিক দেবীর মূর্তি’ বলে আখ্যা দিচ্ছে।

জানা গেছে, ভাস্কর্য সরানোর দাবিতে প্রথম সরব হয় চরমোনাই পীরের দল বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। এরপর সক্রিয় হয় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ১০ মার্চ চট্টগ্রামের এক সমাবেশে সংগঠনটির নেতারা ভাস্কর্য না সরালে ২০১৩ সালের মতো আবার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়ার হুমকি দেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক ওলামা লীগের একাংশও ভাস্কর্য সরানোর দাবিতে ৪ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে। সংগঠনের সভাপতি মুহাম্মদ আখতার হুসাইন বুখারী ওই কর্মসূচিতে বলেন, ‘মূর্তি যে-ই বসাক না কেন, এর দায়ভার পুরোটাই সরকারের ওপর বর্তায়। মূর্তি অপসারণ না করলে হাইকোর্ট ঘেরাও করা হবে।’

ওলামা লীগের ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থান আওয়ামী লীগ সমর্থন করে কি না, জানতে চাইলে ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি অনেক নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা মনে মনে সমর্থন করছেন।’

সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ধর্মভিত্তিক সংগঠন ও বিশিষ্ট আলেমরাও ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নেসের সদস্য গোলাম মাওলা নক্সবন্দী প্রথম আলোকে বলেন, ইসলাম সব ধরনের মূর্তির সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করে।

সরকার-সমর্থক আলেম শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব ফরিদ উদ্দীন মাসউদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূর্তি বলেন বা ভাস্কর্য, বিষয়টি মৌলিকভাবে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি শিরক। এত দিন যেটি ছিল না, তা করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করা ঠিক হয়নি।’

ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি গত রোববার প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান। মানববন্ধনে যাওয়া প্রসঙ্গে শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূর্তি বলেন, ভাস্কর্য বলেন, সেটি তো সুপ্রিম কোর্টের সামনে ছিল না। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সরকার দৃষ্টি সরানোর কৌশল থেকে ইস্যুটি তৈরি করেছে।’

ধর্মভিত্তিক দল ও বিএনপি জোটের সাবেক শরিক ইসলামী ঐক্যজোটও বিক্ষোভ মিছিল ও আলোচনা সভা করেছে। বিবৃতি দিয়ে ভাস্কর্য সরানোর দাবি জানিয়েছে বিএনপি জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ আরও কিছু দল।

এরই মধ্যে ২০১৩ সালে করা শাহবাগ থানার একটি মামলায় হেফাজতের ২৫ জন নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এ নিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলোতে নানামুখী আলোচনা আছে। কারণ, পরোয়ানা জারির মামলাটির প্রধান আসামিদের মধ্যে ২০-দলীয় জোট ও এর বাইরের ঘরানার নেতারাও আছেন। এর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহও রয়েছেন। এই দলটি এক বছর আগে বিএনপির জোট ছেড়ে যায়। এর নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে সরকারি মহলে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে বলেও কথাবার্তা আছে। এ কারণে হঠাৎ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাসও আছে। যদিও দলটির যুগ্ম মহাসচিব আহলুল্লাহ ওয়াছেল বলেন, অনেকের সন্দেহ, আন্দোলনরত নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন