বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অবশ্য আউয়াল এখন আর একা নন। আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী নারীদের দিয়ে টুপিতে নকশা তৈরির কাজ করাচ্ছেন। কাজ আসে ফেনী ও নোয়াখালীর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও। দেশ ছাড়িয়ে এ টুপি যাচ্ছে বিদেশে। প্রতি টুপিতে নারীরা মজুরি পাচ্ছেন ৪৫০ থেকে ৫৫০ টকা। মধ্য প্রাচ্যের দেশ ওমানে এ টুপি বিক্রি হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকায়।

আউয়াল সকাল হলেই মোটরসাইকেলে ছুটে চলেন বিভিন্ন গ্রামে। নারীদের টুপি তৈরির সরঞ্জামাদি ও কাজ বুঝিয়ে দেন। তার আছে একাধিক সুপারভাইজার। তারা মজুরি পরিশোধ করে পণ্য বুঝে নেওয়ার কাজ করেন। আগে দেশে বিক্রি করলেও এখন ওমানে আছে আউয়ালের টুপির দোকান। মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টুপি পাঠান ওমানে।

কাউনিয়া সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরের শাহবাজ গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আব্দুল আউয়ালের। চার ভাই বোনের মধ্যে আউয়াল তৃতীয়। ১৯৮০ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন। আউয়াল জানান, ২০০৫ সালের মধ্য জুনে ব্যক্তিগত কাজে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। দুপুরে গাবতলীতে হোটেলে খাচ্ছিলেন। একই টেবিলে এসে বসেন আরেক ব্যক্তি। খেতে খেতে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। নাম আব্দুস সালাম। বাড়ি ফেনী জেলায়। সালাম নকশি করা টুপি পাইকারি বিক্রি করেন। নোয়াখালি ও ফেনী জেলায় ওই টুপি তৈরি হয়। গ্রামগঞ্জে নারীরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে সুই সুতা দিয়ে টুপিতে নকশি তোলেন।

বিষয়টি আউয়ালের মনে ধরে। ২০ দিন পর আউয়াল চলে যান ফেনীর দাগনভূঁইয়া উপজেলার দুধমুখা গ্রামে আব্দুস সালামের বাড়িতে। ১০ দিন সেখানে থেকে রপ্ত করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। গ্রামে ফিরে ১৫ জন গরিব নারীকে নির্বাচন করেন। তাঁদেরকে ১০–১৫ দিন টুপিতে নকশা তোলার কাজ শেখান। এদের দেখাদেখি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে নারীদের সম্পৃক্ততা। টুপিতে নকশি তোলার কাজ ছড়িয়ে পড়ে কাউনিয়ার বিভিন্ন গ্রামে।

আউয়ালসহ অন্য ব্যবসায়ীরা জানান, কাউনিয়ার প্রাননাথ, পল্লীমারি, ধুমগড়া, আজমখাঁ, রাজিব, হযরতখাঁ, তালুক শাহাবাজ, হরিশ্বর, নিজপাড়া, শাব্দী, খোপাতি ও বরুয়াহাটসহ অন্তত ২০টি গ্রামের ২০ হাজার নারী এখন টুপিতে নকশা করার কাজের সঙ্গে যুক্ত। এর বাইরে রংপুর সদরের জমচওড়া, চওড়ারহাট, কিশামত, চাঁদকুঠি, নাছনিয়ার বিল, গঙ্গাচড়া উপজেলার মৌভাষা,খলিফাবাজার, খামারটারি, চৌদ্দমাথা, মর্ণেয়া, মিলনবাজার, তালপট্টি এবং পীরগাছা উপজেলার দামুড় চাকলা, চাঁনঘাট, ইটাকুমারি, পেটভাতা, কালিগঞ্জ, হাড়িয়াপাড়া, কান্দেব, হায়াতখাঁ, পাইকপাড়া, মংলাকুঠিসহ আরও কয়েকটি গ্রামের আরও অন্তত ২০ হাজার নারী সাংসারিক কাজের পাশাপাশি টুপিতে নকশি তোলার কাজ করে আয় করছেন।

আউয়াল বলেন, ‘আমার অধীনে অন্তত ১০ হাজার মেয়ে টুপিতে নকশি তুলে অনেকটা স্বাবলম্বী হয়েছে।’ বাকি নারীরা যাদের কাজ করেন তাদের মধ্য অন্যতম কাউনিয়ার খোপাতি গ্রামের রায়হান হোসেন ও কাউনিয়া সদরের আহম্মেদ হোসেন। গত পাঁচবছর ধরে এরা টুপির ব্যবসা করছেন। তাঁরাও প্রতিমাসে গড়ে ৩০ হাজার টুপি পাঠাচ্ছেন ওমানে। রায়হান বলেন, ‘করোনা না থাকলে ঈদের আগে আমি একাই ৫০ হাজার টুপি বিদেশে পাঠাতে পারতাম। করোনা আমাদের অনেক ক্ষতি করছে।’

গঙ্গাচড়া ও রংপুর সদর উপজেলায় নারীদের তৈরি টুপি ভোলা জেলার ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী, জহির রায়হান, ফেনির ছাগলনাইয়া গ্রামের গোলাম মোস্তফা তাঁদের এজেন্টদের মাধ্যমে কিনে নেন। ভোলার ব্যবসায়ী ইউসুফ বলেন, ‘প্রতিমাসে গড়ে অন্তত ৪০ হাজার টুপি আমি চট্টগ্রামের তিন ব্যবসায়ীকে দেই। তাঁরা টুপিগুলো বিদেশে পাঠান।’

সম্প্রতি কাউনিয়ার শাহাবাজ গ্রামে গেলে গৃহবধূ আমিনা খাতুন বলেন, ‘আগে সংসারে কমবেশি অভাব-অনটন, কলহ–বিবাদ ছিল। টুপি আমাদেরকে নতুন দিন দিয়েছে।’ নিজপাড়া গ্রামের মেহেনা বেগম বলেন, ‘চার বছর আগে এক ছেলে, এক মেয়েসহ স্বামী ফেলে চলে গেছে। আউয়াল চাচাই আমাকে বাঁচার পথ দেখিয়েছেন। টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছি। ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিয়েছি। দুটি গাভি ও চারটি ছাগল কিনেছি।’ ওই গ্রামেরই আফরোজা বেগম বলেন, ‘আউয়াল দাদা টুপির কাজ দিয়ে বাঁচিয়েছেন। মাসে ৩-৪ হাজার টাকা আয় করি।’

ব্যবসায়ীরা জানান, টুপি তৈরির জন্য সাদা কাপড়কে প্রথমে কাটিং করা হয়। কাটিং কারিগর প্রতি টুপিতে ১০ টাকা পান। কাপড় কাটা হয় দুই ভাগে। এরপর তাতে নকশা করা হয়। নকশা শেষ হলে মেশিনে সেলাই করে টুপি তৈরি হয়। প্রতিটি টুপি সেলাইয়ের জন্য দর্জি পান ৪০ টাকা। আর নকশা ভেদে প্রতি টুপির জন্য নারীরা মজুরি পান ৪৫০-৫৫০ টাকা।

আব্দুল আউয়াল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘরের কাজের ফাঁকে তাঁরা টুপিতে নকশা তোলেন। মাসে কেউ দুইটি আবার কেউ ৯টি টুপিতে কাজ করেন। প্রকারভেদে প্রতিটি নকশি তোলা টুপির জন্য নারীদেরকে মজুরি দেই ৪৫০-৫৫০ টাকা। মাস শেষে নগদ টাকা দিয়ে আমাদের সুপারভাইজার টুপি নিয়ে আসেন।’

আউয়াল জানান, এই টুপি শুরুতে নোয়াখালী ও ফেনীর ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতেন। গত ১১ বছর থেকে ওমানে পাঠাচ্ছেন টুপি। সেখানে প্রতিটি টুপি বিক্রি হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকায়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শপিং মলেও এ টুপি পাওয়া যায়। ওমানে আউয়ালের একটি টুপির দোকানও আছে। একমাত্র ছেলে মাহমুদুল হাসান ওই দোকান চালান। প্রতিমাসে ২০-২৫ হাজার টুপি ওমান পাঠান তিনি।

বাড়িতে দালান ঘর আছে আউয়ালের। পাঁচ একর জমি ও মোটরসাইকেল কিনেছেন। চার মেয়ে, এক ছেলে নিয়ে সুখে আছেন বলে জানান তিনি।

পীরগাছা উপজেলার পেটভাতা গ্রামের সাবিনা ইয়াসমিন বললেন, ‘আগে সংসারে কেউ দাম দিতো না। টুপিতে নকশি তুলে টাকা রোজগার করায় এখন একটু গোনে।’ তিনি বলেন, ‘ আমার কাজ করি ফেনীর টুপি ব্যবসায়ী মিলন রহমানের। তিনি আমাদেরকে সুই সুতা ও কাপড় সরবরাহ করেন। মাসের শেষে নকশি তোলা টুপি তাঁর সুপারভাইজার এসে নিয়ে যায়।’

গঙ্গাচড়ার তিস্তার চরের গৃহবধূ ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘আমি ও আমার মেয়ে ইরা মণি মিলে মাসে আটটি টুপিতে নকশি তুলি। প্রতিমাসে গড়ে আয় হয় চার হাজার টাকা। একটি গাভি কিনেছি। স্বামীকেও সংসার খরচের জন্য প্রতিমাসে কিছু টাকা দেই।’
কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী ও সদস্য পলাশ সরকার বলেন, আউয়াল এলাকায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন। হাজারো নারী এখন টুপিতে নকশার কাজ করে বাড়তি বসে আয় করছেন। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরাচ্ছেন।

কাউনিয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেবেকা ইয়াছমিন প্রথম আলোকে বলেন, কাউনিয়ার প্রায় প্রতিটি ঘরে নারীরা টুপিতে নকশা তৈরির কাজ করে সংসারে অর্থের যোগান দিচ্ছেন। এতে অভাবী সংসারে অন্য সদস্যদের কাছে নারীদের গুরুত্ব বেড়েছে। এর জন্য উদ্যোক্তরাও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন