বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রি। যুদ্ধ–পরবর্তী দেশে তখন খাদ্যসংকট ছিল। এমন বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ, পরিবেশ উপযোগী আধুনিক ধান এবং লাগসই ধান উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়ে ব্রি কাজ শুরু করে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ সাফল্যের একটি বড় অবদান রয়েছে ব্রির। ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০৬ জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে এ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৭টি হাইব্রিড ও ৯৯টি ইনব্রিড। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় এবং গড় ফলনের হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার প্রথম। ব্রির উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে এ অর্জনের পথ সুগম হয়েছে। গবেষণা ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে সহায়তার জন্য ব্রিতে তিনটি সাধারণ সেবা এবং আটটি প্রশাসনিক শাখা রয়েছে। ব্রির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে বর্তমানে ৩০৮ জন বিজ্ঞানী কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা জানান, খাদ্যনিরাপত্তাকে টেকসই করার জন্য শুরু থেকেই স্থানভিত্তিক জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ পর্যন্ত ১৩ বছরে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এর মধ্যে রয়েছে খরা, বন্যা, লবণসহিষ্ণু, জিংকসমৃদ্ধ, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চফলনশীল। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১২টি লবণসহিষ্ণু, তিনটি খরাসহনশীল, তিনটি বন্যাসহনশীল, দুটি জোয়ারসহনশীল জাত ও তিনটি শীতসহনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। উচ্চ তাপমাত্রা বা হিটশক–ঝুঁকি এড়াতে উচ্চ তাপমাত্রাসহনশীল একটি জাত নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করা হচ্ছে।

গত পাঁচ দশকে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। ১৯৭০-৭১ সালে এ দেশে চালের উৎপাদন ছিল এক কোটি টন। বর্তমানে দেশে যখন জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, তখন চাল উৎপাদিত হচ্ছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টনের বেশি। যে জমিতে আগে হেক্টরপ্রতি দুই থেকে তিন টন ফলন হতো, এখন সেখানে ফলন হচ্ছে ছয় থেকে আট টন।

বিজ্ঞানীরা জানান, লবণসহিষ্ণু জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে। ফলে দেশে মোট উৎপাদনও বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাত সম্প্রারণের মাধ্যমে ১২ শতাংশ আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। জলমগ্নতা–সহনশীল জাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬ শতাংশ এলাকা চাষের আওতায় এসেছে, যেখানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯ ভাগ। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটাসহনশীল জাত (ব্রি ধান-৭৬, ৭৭) উদ্ভাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমি ধান চাষের আওতায় এসেছে।

গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী এলাকার কৃষক মো. জাফর আলী (৬৫) বলেন, তাঁরা অনেক দিন ধরে ব্রি ধান–২৮ এবং ব্রি ধান-২৯ চাষ করছেন। তখন থেকেই এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছে যে এই ধান চাষ করলে ফসল ভালো হয়। তবে এখন মানুষ নানা ধরনের ধান চাষ করছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ধানের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। নওগাঁর মান্দা এলাকার সফল কৃষক জাহাঙ্গীর শাহ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, নতুন জাতের প্রায় সবই ভালো। তবে চিকন ব্রি ধানের জাতগুলো বেশ ভালো ও দ্রুত ফলন দেয়। এই জাতগুলো ১২০ থেকে ১২৫ দিনের মধ্যে ফলন দেয় বলে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান খোন্দকার ইফতেখারুদ্দৌলা বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি, প্রোটিন ও মিনারেল আসে ভাত থেকে। ভাত তাঁদের কাছে সহজলভ্য। সাধারণ মানুষ দুধ, ডিম, মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারলেও ভাত নিয়মিত খেতে পারছেন। তাই ভাতের মাধ্যমে কীভাবে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।

চাল ছেঁটে যেন চালকে অনিরাপদ করতে না হয়, সে জন্য ব্রি প্রিমিয়াম কোয়ালিটিসম্পন্ন জাত, যেমন ব্রি ধান–৫০, ব্রি ধান–৬৩, ব্রি ধান–৭০, ব্রি ধান–৭৫, ব্রি ধান–৮০, ব্রি ধান–৮১, ব্রি ধান–৮৪, ব্রি ধান–৮৬, ব্রি ধান–৮৮ ও ব্রি ধান–৯০ উদ্ভাবন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে ৬টি জিংকসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করেছেন। পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান, যেমন প্রোটিন, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ জাতসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবন করেছেন। এদিকে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে এ বছর জিংকসমৃদ্ধ জাত বঙ্গবন্ধু ধান–১০০ অবমুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বর্তমানে খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখার জন্য কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘২০৫০ সাল পর্যন্ত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা কীভাবে ধরে রাখা যায়, সেটি নিয়ে কাজ চলছে। দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের চালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে ধান বা চাল রপ্তানির বাজার বৃদ্ধির জন্য নানা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’ এদিকে নতুন জাত উদ্ভাবনের সময় কমানোর জন্য চেষ্টা চলছে। নতুন জাত উদ্ভাবনে এখন সাত থেকে আট বছর গবেষণা করতে হয়। এ সময়কে কমিয়ে তিন থেকে চার বছরে নিয়ে আসার জন্য গবেষণা করা হচ্ছে। আগামী বছর আরও বেশ কয়েকটি উচ্চফলনশীল নতুন জাত কৃষকদের মধ্যে ছাড়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন