লন্ডনে বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে (ইকসিড) কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর করা মামলায় বেকায়দায় পড়েছে সরকার। আদালত ইতিমধ্যে নাইকোর গ্যাসের দাম পরিশোধ করার রায় দিয়েছেন। কিন্তু মামলা পরিচালনায় ত্রুটির কারণে নাইকোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অপর দিকে, নাইকো টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খননের জন্য নিরাপত্তা জামানত হিসেবে রাখা টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে। কুমিল্লা অঞ্চল নিয়ে গঠিত স্থলভাগের ৯ নম্বর তেল-গ্যাস ব্লকে তাদের যে শেয়ার রয়েছে, তা বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই অবস্থায় সরকার নাইকোর সঙ্গে চুক্তিটিকে অবৈধ আখ্যায়িত করে সেটি বাতিলের জন্য নতুন মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যে দুবার লন্ডন সফর করেছে। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া সরকার ইকসিডে মামলার আইনজীবী তৌফিক নেওয়াজকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। তিনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির স্বামী। মামলার তত্ত্বাবধানকারী, পেট্রোবাংলার সাবেক সচিব (পরে সিলেট গ্যাসফিল্ডস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক) ইমাম হোসেনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০০৮ সালে নাইকোর বিরুদ্ধে করা ক্ষতিপূরণ মামলা পরিচালনার জন্য নতুন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে কথা বলার জন্য চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি তৌফিক নেওয়াজকে।
সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, ইকসিডে মামলা পরিচালনায় ত্রুটির জন্য এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মামলার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সরকার দেখেছে যে বাংলাদেশ পক্ষ থেকে সঠিকভাবে মামলাটি আদালতে উপস্থাপন ও পরিচালনা করা হয়নি। এমনকি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষেও অনেক কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের কিছু লোক জড়িত। একইভাবে তাঁরা ঢাকার আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও শ্লথ করে রেখেছেন। তবে ফেনী ক্ষেত্রের গ্যাসের দাম পরিশোধে দেওয়া ইকসিডের রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকার তিন মাস (আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত) সময় নিয়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ইকসিড (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট) সুদসহ গ্যাসের দাম পরিশোধের রায় দেয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মুদ্রায় নাইকোর আসল পাওনা প্রায় ২১৬ কোটি টাকা (২৭ মিলিয়ন বা ২৭০ কোটি ডলার)। এই অর্থ ২০০৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০১০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহ করা গ্যাসের দাম। এর সঙ্গে ২০০৭ সালের ১৪ মের পরবর্তী সময়ের জন্য নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধ করতে হবে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ইকসিড ও ঢাকায় মামলা পরিচালনায় ত্রুটি ও গাফিলতি ছিল। সে জন্য কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। হয়তো সরকারকে এ জন্য লন্ডনের আদালতে নতুন একটি মামলা করতে হবে।
সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলো জানায়, গত ১৭-২২ জানুয়ারি লন্ডন সফরের সময় নাইকোর আইনজীবীদের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সেখানে নাইকোর চুক্তির বৈধতা, মামলার জটিলতা প্রভৃতি বিষয়ে উভয় পক্ষ খোলামেলা কথাবার্তা বলেছে। এই প্রেক্ষাপটে আদালতের বাইরেও নাইকোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধের বিষয়গুলো মীমাংসার সম্ভাবনা আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি আদালতের বাইরে মীমাংসা হওয়া সহজ নয়। নতুন মামলা না করে ক্ষতিপূরণ আদায় কঠিন হতে পারে। সরকার এভাবেই ভাবছে এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পরামর্শের জন্য আইনমন্ত্রী ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী গত সোমবার রাতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ সহকারী ম. তামিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই নাইকোর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করা হয়েছিল।
মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট: সরকার টেংরাটিলা, ফেনী ও কামতা গ্যাসক্ষেত্রকে ‘প্রান্তিক’ (যে ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে) দেখিয়ে সেখান থেকে গ্যাস তোলার জন্য ১৯৯৯ সালে নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি করে। ওই চুক্তির অধীনে নাইকোর অদক্ষ কূপ খনন প্রক্রিয়ার কারণে ২০০৫ সালে দুবার (৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন) সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে ওই গ্যাসক্ষেত্র ও সন্নিহিত এলাকায় পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সরকার তথা পেট্রোবাংলা প্রথমে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু তা সফল না হওয়ায় ২০০৮ সালে ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করে।
অপর দিকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে নাইকো-বাপেক্সের যৌথ চুক্তির অধীনে গ্যাস তুলে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল। টেংরাটিলা বিস্ফোরণের পর পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) হাইকোর্টে একটি মামলা করে। তাতে টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা ছাড়াও বলা হয়, নাইকোর সঙ্গে সরকার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তিটি করেছে। তাই চুক্তি বাতিল করা দরকার। কিন্তু হাইকোর্ট চুক্তি বাতিলের কোনো নির্দেশনা দেননি। তবে টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত নাইকোকে ফেনীর গ্যাসের দাম পরিশোধ না করার আদেশ দেন। ফলে পেট্রোবাংলা নাইকোকে গ্যাসের দাম দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
পরে অবশ্য কানাডার আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে ওই চুক্তি সম্পাদনে দুর্নীতি হয়েছিল। সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনকে ২০০৫ সালে একটি দামি গাড়ি ও ভ্রমণব্যয়ের পাঁচ হাজার ডলার ঘুষ দেওয়ায় দণ্ডিত হয়েছে নাইকো।
বাণিজ্যিক স্বার্থে বিদেশে ঘুষ দেওয়া প্রতিরোধসংক্রান্ত কানাডার আইনে সে দেশের একটি আদালতে ২০০৯ সাল থেকে এই মামলা চলছিল। নাইকো দোষ স্বীকার করায় ২০১১ সালে ওই আদালত দণ্ড হিসেবে ৯৪ লাখ ৯৯ হাজার কানাডীয় ডলার (৯৭ লাখ ৫০ হাজার ৭৯৪ মার্কিন ডলার) জরিমানার আদেশ দেয়।
এ ছাড়া অভিযোগ আছে, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নাইকোকে ওই তিনটি ক্ষেত্র দেওয়া হয়। এ জন্য গ্যাসক্ষেত্র তিনটি প্রান্তিক হিসেবে দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা প্রান্তিক ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুটি সরকারের আমলেই এ কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলে। আর ওই চুক্তি সম্পাদনের সময় জ্বালানিসচিব ছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দুই নেত্রী শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া এবং তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীসহ অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছিল।
ইকসিডে মামলা: নাইকো ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল একটি এবং ১৬ জুন আরেকটি মামলা ইকসিডে দায়ের করে। মামলা দুটিতে নাইকো ইকসিডের কাছে দুটি বিষয়ে আদেশ চায়। এক. টেংরাটিলায় বিস্ফোরণের দায় তাদের ওপর বর্তায় কি না এবং বাংলাদেশ ও পেট্রোবাংলা এই ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে কি না। দুই. ফেনী ক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করা গ্যাসের দাম পরিশোধ পেট্রোবাংলা বন্ধ রাখতে পারে কি না।
এই মামলার শুনানির এক পর্যায়ে, গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নাইকোর গ্যাসের দাম পরিশোধসংক্রান্ত মামলাটির রায় ঘোষণা করে ইকসিড। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনো আদেশের অপেক্ষায়। তবে মামলার কার্যক্রমে বাংলাদেশের ক্ষতিপূরণ দাবির বিষয়টি যথাযথভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন