নারায়ণগঞ্জে করোনা যে সুযোগ নিয়েছে

বিজ্ঞাপন
default-image

দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুরের শিবচরে। পরে ঢাকার বাসাবো, টোলারবাগসহ ঢাকার বাইরে ১৮ জেলায় ছড়িয়ে গেছে। এখন করোনাভাইরাস ছড়ানোর একটা অন্যতম বড় স্থান নারায়ণগঞ্জ। সারা দেশেই নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া যাচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজনের কথায় উঠে এসেছে, লকডাউনে দেরির সুযোগ নিয়েছে করোনা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে আজ পর্যন্ত করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছেন ২১৮ জন। মারা গেছেন ২০ জন। এর মধ্যে ঢাকায় এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ১২৪ জন। নারায়ণগঞ্জে গতকাল পর্যন্ত ৩৮ জনের মধ্যে এ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে মারা গেছেন ৫ জন। আরেকজন করোনার লক্ষণ নিয়ে মারা গেলেও তাঁর পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যায়নি।

প্রথম আক্রান্ত জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জে কি পর্যাপ্ত সতর্কব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়। রোগটি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ১৯ মার্চ সরকার শিবচর উপজেলা লকডাউন ঘোষণা করে, যা বাংলাদেশে প্রথম। এ ছাড়া প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই প্রবাসী পরিবারগুলোকে কোয়ারেন্টিনে রাখা, কোথাও কোথাও আংশিক লকডাউন করাসহ নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, এতে কাজ দিয়েছে। এখন পর্যন্ত পুরো মাদারীপুর জেলায় আক্রান্ত ১১ জনের মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর ৯ জনই লকডাউন ঘোষণার আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে প্রথম এ ভাইরাসে শনাক্ত হওয়ার ঠিক এক মাস পর আজ বুধবার থেকে পুরো জেলা লকডাউন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা শিবচরের চেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। জেলাটিতে ৪০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। শহরের ভেতর ইপিজেড, পোশাক কারখানা, হোসিয়ারিসহ ভারী শিল্প কলকারখানার পাশাপাশি চাল, ডাল, আটা, ময়দা, লবণসহ নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজার রয়েছে।

এ কারণে এলাকাটি শ্রমিক–অধ্যুষিতও। করোনার বিস্তারের মধ্যেও কারখানা-ব্যবসা চলেছে অবাধে। গত শনিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সিটি এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে লকডাউন করে কারফিউ জারি করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান। তাঁর এই আহ্বানের পর গতকাল পর্যন্ত নতুন করে ২৭ জন শনাক্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দুই সপ্তাহ ধরেই কড়াকড়ি আরোপ, লকডাউনের কথা বলে আসছেন। আরও আগেই লকডাউন করা উচিত ছিল। তবে এখনো সময় আছে, সবাই মিলে একযোগে কাজ করে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে জনগণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কোনোভাবেই যাতে অপ্রয়োজনীয় ঘোরাফেরা কেউ করতে না পারে, সেটা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে শুরুতেই ৫০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট করা হয়। প্রতিটি উপজেলাতেও ৫ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট হয়। তবে শুরুতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সেখানে রাখার ব্যাপারে এতটা তৎপরতা দেখা যায়নি। এ ছাড়া চিকিৎসকদের সুরক্ষাসামগ্রীও দেরিতে পৌঁছেছে। বর্তমানে শহরের আইসোলেশন সেন্টারে ১৫ জন ভর্তি আছেন। শহরে কোয়ারেন্টিন করার জন্য ব্যবস্থা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাউকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানী ঢাকা নানা কারণে লকডাউন করা কঠিন। নারায়ণগঞ্জে অসম্ভব ছিল না। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চাপে হয়তো নারায়ণগঞ্জ লকডাউন করা হয়নি।

নারায়ণগঞ্জে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন বিভাগের তৎপরতায় ঘাটতি ছিল বলে মনে করেন জেলার নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রফিউর রাব্বী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রথম দিকে প্রশাসন বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। পোশাক কারখানা, বাজারঘাট অবাধে চলেছে। কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, করোনা শনাক্তের পরীক্ষা কোনো কিছুতেই জোর দেওয়া হয়নি। প্রথম আক্রান্ত এবং সংখ্যা বেশি পাওয়ার যাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে একটি পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন করার দরকার ছিল। অর্থাৎ, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়েছে। এখন লকডাউন হয়েছে। মানুষকে ঘরে রাখতে হবে। পাশাপাশি করোনার পরীক্ষা বাড়াতে ল্যাব স্থাপন করা দরকার।

নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্য জেলায়ও করোনা ছড়িয়েছে। নরসিংদী, টাঙ্গাইল, গাজীপুরে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা নারায়ণগঞ্জে ছিলেন। গতকাল রাতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ভাওড়া এলাকায় একজনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি ক্লিনিকে চাকরি করতেন বলে জানা গেছে। ফলে ওই এলাকায় এখন লকডাউন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নরসিংদীতে দুজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাঁরা দুজনই নারায়ণগঞ্জে চাকরি করতেন। গত সোমবার প্রথম নরসিংদীর পলাশের ডাঙ্গা ইউনিয়নে একজন শনাক্ত হন। তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। গতকাল নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পলাশতলী ইউনিয়নের শাহপুর গ্রামের এক বাসিন্দা শনাক্ত হন। তিনি একটি ওষুধ কোম্পানিতে নারায়ণগঞ্জে চাকরি করেন। গতকাল গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ঠান্ডা, সর্দি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তবে তাঁর করোনা পরীক্ষা হয়নি এখনো হয়নি।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ আগে থেকেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সমস্যা হয়। এটা জেনেও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নারায়ণগঞ্জকে অবহেলা করা হয়েছে। এটা ভোগাবে। অনেক আগেই নারায়ণগঞ্জ লকডাউন করা উচিত ছিল। এখন শুধু সড়ক নয়, নৌপথেও নারায়ণগঞ্জে গমনাগমন ঠেকাতে হবে। আর যারা এই জেলা ছেড়ে চলে গেছে, তাদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।

বিশিষ্ট এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, ঢাকার টোলারবাগ, বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, গাইবান্ধা, শিবচরসহ যেসব স্থান ক্লাস্টার হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল, সে সব জায়গা নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। অনেক আগেই কোরোনা শনাক্ত বাড়ানো, মানুষের চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা দরকার ছিল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন