বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ এবং খুলনার দাকোপ ও কয়রা—চার উপজেলার সব কটি অর্থাৎ ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখন তাহমিনার মতো পানির কষ্ট ভুলেছেন। আরও প্ল্যান্টসহ সাত ধরনের পানির আধারের মাধ্যমে এসব মানুষকে লবণাক্ত এই এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবযাত্রা প্রকল্পের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহের এ কাজ চলছে। প্রকল্পে সহায়তা করছে মার্কিন সরকারের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডি।

মা ও শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি চর্চা, কৃষি ‍ও জীবিকায়ন, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো, সুশাসন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নারী-পুরুষ সমতা—এই পাঁচটি বিষয় আছে এই নবযাত্রা প্রকল্পে। এগুলোর মধ্যে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনের কর্মকাণ্ড পর্যায়ে দেখার জন্য সম্প্রতি এই প্রতিবেদক কালীগঞ্জে যান। এর মধ্যে উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের আরও প্ল্যান্ট এবং কালিকাপুর গ্রামের আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত প্ল্যান্ট (এআইআরপি) ঘুরে দেখেন।

আরও এবং এআইআরপি ছাড়া আরও পাঁচ পদ্ধতিতে পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে গভীর নলকূপ, পোলার স্যান্ড ফিল্টার, সোলারপন্ড স্যান্ড ফিল্টার, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, সমাজভিত্তিক পানি সরবরাহ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পানির ব্যবস্থাপনায় মূল দায়িত্বে আছেন নারীরা। যেমন আরও প্ল্যান্ট ব্যবস্থাপনায় আছে ২২ সদস্যের কমিটি। এর মধ্যে সভাপতি, সচিব, কোষাধ্যক্ষসহ ১২ জনই নারী।
পানিয়া গ্রামের আরও প্ল্যান্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বললেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকে পানির কষ্ট করতে দেখতিছি এ গ্রামের মানুষকে। আমরা নারীরা এই কষ্ট সবচেয়ে বেশি ভোগ করি। কিন্তু এই প্ল্যান্ট সেই কষ্ট ভুলিয়েছে।’
আরও প্ল্যান্ট তৈরি করতে অন্তত ২২ লাখ টাকা লাগে। এই প্ল্যান্ট তৈরির প্রায় পুরো অর্থ এসেছে নবযাত্রা প্রকল্প থেকে। তবে ব্যবস্থাপনার খরচ এই কমিটিকেই বহন করতে হবে। এর জন্য একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। একেকটি আরও থেকে ৩০০ পরিবার পানি সংগ্রহ করতে পারে। তাদের প্রত্যেকেরই এখানে অর্থ আছে। ব্যাংকে কমিটির নামে একটি হিসাব খোলা হয়েছে। পানি বিক্রির অর্থ সেখানে জমা হয়। আরও ব্যবহারকারীদের অর্থ আদায়, হিসাব দেখভাল করতে একজন আছেন। তিনিই একমাত্র বেতনভুক্ত। পানি বিক্রির টাকায় তাঁর বেতন হয়।

default-image

পানিয়ার তহমিনা বা গ্রামের অন্যদের সমস্যা ছিল লবণাক্ততা। কিন্তু কালিকাপুর অর্পিতা বা শ্রাবণী দের সমস্যা পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি। কালীগঞ্জ সদর থেকে আট কিলোমিটার দূরের গ্রাম কালিকাপুর। এখন এ গ্রামের প্রায় ৭০ পরিবার এআইআরপি থেকে পানি নিচ্ছে। গ্রামের শ্যামল বসাক বাড়ির সামনে এটি তৈরি করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে টিউবওয়েলে পানি বিশেষ দুই ধরনের ছাঁকনির মাধ্যমে পরিশোধিত হয়। গ্রামের শ্রাবণী দের কাছে এ এক বড় পাওয়া। কারণ, বছর দুয়েক আগেও এ গ্রামের মানুষদের সদর উপজেলা থেকে ভ্যানে আনা পানি কিনে খেতে হতো। প্রতি লিটার পানির জন্য দিতে হতো এক টাকা।

শ্রাবণী দে বলছিলেন, ‘ঝড়–বৃষ্টি হলে পানি আসত না। তখন চরম সমস্যা হতো। আর জল খেতি হতো মেইপে মেইপে। এখন যখন ইচ্ছা জল নিতি পারি।’

এখানেও একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে চলে এআইআরপিটি। এ কমিটির ১২ সদস্যের ৮ জনই নারী। কালিকাপুরের এআইআরপি নির্মাণের সব খরচ এসেছে নবযাত্রা প্রকল্প থেকে।

পানির ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ এগুলোর স্থায়িত্বকে আরও নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করেন ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবযাত্রা কর্মসূচির কালীগঞ্জের অপারেশনস ম্যানেজার আশিক বিল্লাহ। তিনি বলেন, ‘পানির কষ্ট যেভাবে একজন নারী বোঝেন, তেমনটা কেউ বোঝে না।’

default-image

কালিকাপুরের মানুষের পানির খরচও কমেছে। গ্রামের নারী স্বপ্না দে বলছিলেন, ‘আগে যে পানি কিনতাম, তা শুধু খেতাম। রান্নাটা টিউবওয়েলের পানিতেই করতি হতো। প্রতি মাসে আগে লাগত সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এখন ২০ টাকায় সারা মাসের পানি হয়।’

আরও, এআইআরপি বা অন্য যেসব পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, সেই পানির মান নিশ্চিত হচ্ছে কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে নবযাত্রা প্রকল্পের ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) খাতের কারিগরি পরামর্শক মো. আয়াতুল্লাহ আল মামুন বলেন, এসব স্থাপনা স্থানীয় মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার আগে দুই দফায় পানির মান পরীক্ষা করা হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচও) এই প্রকল্পের ল্যাবরেটরিতে গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়। মান নিশ্চিত হলেই উপকারভোগীদের কাছে স্থাপনা হস্তান্তরিত হয়।

এ প্রকল্পকে একটি ‘ভালো কাজের উদাহরণ’ বলে মনে করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগকে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায়।
নবযাত্রা প্রকল্পে যুক্ত থেকেছে স্থানীয় সরকার পরিষদ। ইউনিয়ন এবং উপজেলা পরিষদের সম্মতিতেই চলেছে কাজ।

কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী বলছিলেন, ‘আমার উপজেলার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পানির তীব্র কষ্টে ভোগে। নবযাত্রার উদ্যোগ এ কষ্ট বেশ খানিকটা লাঘব করেছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তৈরি জয়েন্ট মনিটরিং (জেএমপি ২০২১) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মৌলিক পানি সরবরাহের সুবিধা পায় ৯৮ শতাংশ মানুষ, আর নিরাপদ পানি পায় প্রায় ৫৯ শতাংশ। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চল এ সুবিধা থেকে অনেক পিছিয়ে। জেলা খুলনায় মৌলিক পানিপ্রাপ্তির হার ৬৮ শতাংশ, সাতক্ষীরায় প্রায় ৬২ শতাংশ।
নবযাত্রা প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। শেষ হবে আগামী বছর। এর মধ্যে প্রকল্পটির অর্জন নিয়ে জরিপ করেছে ওয়ার্ল্ড ভিশন। তাদের কর্ম এলাকায় আগে ৫২ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানি পেত, সেটি এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশে।

উপকূলের চার উপজেলায় এসব উদ্যোগ নিয়ে কথা হয় বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘উপকূলের মানুষদের সুপেয় পানি দিতে যে ব্যবস্থা এখানে নেওয়া হয়েছে, তা ঠিক আছে। কিন্তু এসব সুবিধা টিকে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।’

অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ টিকে থাকার যে চ্যালেঞ্জের কথা বললেন, এনজিওগুলোর কাজ নিয়ে সেই উদ্বেগ অনেকেরই থাকে। এনজিও প্রকল্পের মাধ্যমে সেসব উদ্যোগের সুফল মানুষ পায়। কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে সেসব উদ্যোগ টেকে না, এমনটা অনেক ক্ষেত্রেই ঘটে। নবযাত্রা প্রকল্প শেষ হলে এসব পানি-স্থাপনা টিকবে তো?

নবযাত্রা প্রকল্পের চিফ অব পার্টি এলেক্স বেকুনদা বলেন, ‘ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। ডিপিএইচইর সঙ্গে পার্টনারশিপ স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় মানুষই এসব এগিয়ে নেবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন