default-image

বাংলায় বঙ্গবন্ধুর হাতে লেখা চিঠিপত্রের ভান্ডার একেবারে কম সমৃদ্ধ নয়। কিন্তু বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলায় লেখা চিঠিপত্রের সংখ্যা বিরল হওয়াটাই স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটা সুবিদিত। কিন্তু তিনি যে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নাটের গুরু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকেই বাংলায় চিঠি লিখেছিলেন, সেটা ভাবনার বাইরে ছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বর বা জানুয়ারির কোনো একদিন মার্কিন জাতীয় মহাফেজখানায় (মেরিল্যান্ডে কলেজ পার্কে অবস্থিত) কাজ করছিলাম। চোখের সামনে বাংলাদেশ–সংক্রান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল নথিপত্রের ঝাঁপি। হঠাৎই নজরে এল বাংলায় টাইপ করা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সই করা একটি চিঠি। বঙ্গবন্ধু এই চিঠির একটি ইংরেজি কপিও দিয়েছিলেন।

চিঠির বিষয়বস্তু অনুধাবনে এর পটভূমি বলা দরকার। সেটা ছিল এ রকম যে যুদ্ধ–উত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষ–বিপক্ষনির্বিশেষে তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর উপমহাদেশীয় রাজনীতি ও কূটনীতির হিসাব–নিকাশের সঙ্গে তা মিলছিল না। স্বাধীনতার পর রিচার্ড নিক্সন বিশেষ করে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার দ্রুত মনোযোগ দেন, বাংলাদেশ যাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না পারে সেই দিকে। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তত দিনে গোঁ ধরেছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি ত্যাগ না করলে তিনি বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন না। বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াতে তিনি ১৯৭৩ সালের পাকিস্তান সংবিধানে ‘পূর্ব পাকিস্তানকে’ প্রদেশ হিসেবেই উল্লেখ করেন। ১৯৭৩ সালে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গায় ছিল উপমহাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণ।

৪৭ বছর আগে ১৯৭৩ সালে নিক্সনকে লেখা বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক চিঠি মুজিব শতবর্ষের একুশ মুহূর্তে আমরা নিচে অবিকল তুলে ধরলাম।

‘মহামান্য রিচার্ড এম. নিক্সন, যুক্তরাষ্ট্র প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান, ওয়াশিংটন।

মহামান্য,

যথা সম্মানের সাথে জানাচ্ছি, আমার তরফ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন এবং সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যৌথভাবে গৃহীত মানবিক উদ্যোগ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অবহিত করার জন্য আমার বিশেষ দূত জনাব এম. আর. সিদ্দিকী যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। বিশ্বের সকলেই জানেন যে বাংলাদেশে অমানুষিক ও নৃশংসতম গণহত্যার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীই দায়ী, যার ফলে নারী-শিশুসহ আমার দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশ হয়েছে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই ঘটনাবলীর আলোকেই ভারত ও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক যুক্ত ঘোষণার পূর্ণ তাৎপর্য অনুধাবন করা প্রয়োজন। এমন কি আজও পাকিস্তান জোরপূর্বক আটক রাখাতে তিন লক্ষ নিরীহ বাংগালী অকথ্য দুঃখ–দুর্দশা এবং চরম নির্যাতন ভোগ করে চলেছেন।

আমার সরকার এই উপমহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য শুরু থেকেই এ ব্যাপারে সক্রিয় ও প্রগতিশীল নীতি অনুসরণ করে আসলেও, দুঃখজনক এই যে পক্ষান্তরে পাকিস্তান এ প্রশ্নে পশ্চাদমুখী ও প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারী ভূমিকা গ্রহণ করে আসছে। পাকিস্তান কর্তৃক সম্প্রতি গৃহীত শাসনতন্ত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে বৈরী উল্লেখ তা’ থেকে এটা আরো একবার প্রতিপন্ন হয়।

পাকিস্তানেরবৈরী ও একগুঁয়ে মনোভাব সত্ত্বেও আমার সরকার দেশের সংবিধান প্রণয়ন এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর উপমহাদেশের সকল অমীমাংসিত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে আমাদের অব্যাহত আন্তরিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সংগতি রেখেই বিগত ১৭ই এপ্রিল ভারত সরকারের সাথে যুক্তভাবে একটি পবিত্র ঘোষণা প্রচার করেছে। এই যুক্ত ঘোষণায় পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী, পাকিস্তানে আটক বাংগালী এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানী, যারা নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছে তাদের যুগপৎ হস্তান্তরের মাধ্যমে সকল মানবিক সমস্যার সমাধান করতে চাওয়া হয়েছে। এটা আমার আন্তরিক বিশ্বাস আমাদের তরফ থেকে গৃহীত এই উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট সরকারগুলিকে রাজনৈতিক ও আইনগত দিক দিয়ে কোন প্রকার বিব্রত অবস্থায় না ফেলে মানবিক সকল সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে গঠনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আমি আরো মনে করি যে বহু সংখ্যক মানুষের দুঃখকেই লাঘবের ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান পাওয়ার মত অনুকূল সুযোগ এখন সৃষ্টি হয়েছে।

এই উপমহাদেশের সকল মানুষের কল্যাণের ব্যাপারে আপনি যে উদগ্রীব সে সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। তাই আমার বিশেষ দূত জনাব এম. আর. সিদ্দিকী উল্লিখিত যুক্ত ঘোষণার উদ্দেশ্যে ও পরিধি ব্যক্তিগতভাবে আপনার সমীপে ব্যাখ্যা করার জন্য সুযোগ কামনা করবেন।

আপনার স্বভাবসিদ্ধ মহানুভবতার সাথে জনাব এম. আর. সিদ্দিকীকে সাক্ষাৎদান এবং তিনি আপনার সমীপে আমার সরকার ও আমার তরফ থেকে যে সকল বক্তব্য রাখবেন তার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনের জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।

মহাত্মন, আমার গভীরতম শ্রদ্ধার আশ্বাস গ্রহণ করুন।

শেখ মুজিবুর রহমান, ২৮ (অস্পষ্ট) এপ্রিল ১৯৭৩ প্রধান মন্ত্রী।’

default-image

ওই চিঠি একটি আনুষ্ঠানিক ও রীতিনীতিনির্ভর কূটনৈতিক পত্র। সুতরাং এর ভাষা ও রচনাশৈলীকে সেই আলোকেই দেখতে হবে। গণহত্যার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীই দায়ী, পাকিস্তান বা পশ্চিমা সভ্যতা এর দায় মোচন করেনি। আমরা ট্রাইব্যুনাল করে বেসামরিক ব্যক্তিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করলাম। বাংলাভাষীদের ওপর পরিচালিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে সামরিক কুশীলবদের কারও বিচার হলো না। মস্কোতে তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত এস কে দেহলভীর (একসময় খুলনায় ডিসি ছিলেন) মাধ্যমে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর কাছে মরিয়া হয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, এখন বিচার বসালে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান হবে।

বাংলায় কথা বলার কারণেই তারা গণহত্যার শিকার হয়েছিল। তাই বাংলায় লেখা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক চিঠি এসব প্রশ্নকেই আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0