বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই প্রাণের উত্তাপ পাওয়া গেছে গতকালই। মা সুমিতা দেবীর সঙ্গে স্কুল অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গতকাল তেজগাঁও গভর্নমেন্ট সায়েন্স হাইস্কুল বিদ্যালয়ে এসেছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শুভন সিংহ। ক্লাস শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে শোভন জানাল, এই স্কুলে সে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। মাত্র দুই মাস ক্লাস হওয়ার পর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো গত বছরের ১৭ মার্চ তার স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়। দেড় বছর পর ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, স্যারদের সঙ্গে সরাসরি কথা হবে—এ নিয়ে খুব উত্তেজনা বোধ করছে সে।

সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ খুললেও শুরুতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস হবে। অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে এক দিন ক্লাস করতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে যেদিন যে শ্রেণির ক্লাস থাকবে, সেদিন ওই শ্রেণির সর্বোচ্চ দুটি ক্লাস হবে। প্রাথমিকে হবে দিনে তিনটি করে ক্লাস। প্রাক্-প্রাথমিক স্তরে সশরীর ক্লাস বন্ধ থাকবে।

দেশে গত জুলাই-আগস্ট মাসের তুলনায় করোনা সংক্রমণ অনেক কমেছে। কিন্তু সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও কেউ করোনার ঝুঁকিমুক্ত নয়। সেই আশঙ্কার সঙ্গে আছে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে সৃষ্ট জড়তাও। আর্থিকসহ নানা কারণে অনেক স্কুলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কাও আছে। তাই শিক্ষাবিদেরা বলছেন, শুরুতেই যেন পড়াশোনা নিয়ে বেশি চাপ দেওয়া না হয়। আনন্দঘন পরিবেশে সবাইকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনাই বড় কাজ। তারপর তাদের ধীরে ধীরে শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।

সন্তানেরা সব মা-বাবার আবেগের অংশ। তাঁরা চান সন্তান স্কুলেও ফিরুক। আবার এই ফেরা যেন নিরাপদ হয়, তা নিয়েও তাঁদের চিন্তা আছে। এই জায়গায় এসে জনস্বাস্থ্যবিদেরা স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। সেখানে স্কুলের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সচেতনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে সরকারের ভাবনটা জানা গেল শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির কথায়। গতকাল জামালপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান হবে। তারপরও সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়, সেটা করতেও দ্বিধাবোধ করা হবে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সারা দেশে দেড় লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় পৌনে দুই কোটি ছাত্রছাত্রী। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির কিছু বেশি। আর কলেজে মোট শিক্ষার্থী প্রায় অর্ধকোটি। বাকি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যমসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সঙ্গে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম ফারুক গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশ থেকে যে খবর পেয়েছেন, তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন ক্লাস শুরুর জন্য প্রস্তুত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বার্তা হলো, প্রবেশের সময় যেন কোনোভাবেই ভিড় না হয়। স্বাস্থ্যবিধি মানাই যেন হয় প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, অভিভাবকদের প্রতি নিবেদন, সন্তানদের আনা-নেওয়ার সময় তাঁরা যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেটে ভিড় না করেন। সবাই সহযোগিতা করলে যে প্রস্তুতি আছে, তাতে কোনো অসুবিধা হবে না বলে আশা তাঁর।

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

গত কয়েক দিনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ২৫টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কমবেশি প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে। গতকাল তেজগাঁও বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথে গোলাকার চিহ্ন দিয়ে জায়গা ঠিক করে রাখা হয়েছে; যাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে পারে। দোতলায় একটি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখা যায় লম্বা বেঞ্চে দুই পাশে রং দিয়ে গোলাকার করে রাখা হয়েছে; যাতে দুই পাশে দুজন শিক্ষার্থী বসে। প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানা শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য দুটি যন্ত্র কীভাবে ব্যবহার করাতে হবে, তা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন একজন কর্মীকে।

রেবেকা সুলতানা জানালেন, তাঁর বিদ্যালয়ে দুই হাজার শিক্ষার্থী। যেহেতু সব শ্রেণির ক্লাস প্রতিদিন হবে না, তাই সমস্যা হবে না। প্রধান শিক্ষকসহ ৫০ জন শিক্ষকের মধ্যে অসুস্থ একজন বাদে বাকি সবাই করোনার টিকা নিয়েছেন।

প্রস্তুতির কিছুটা ঘাটতি দেখা গেছে রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজে গিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগের দিন দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, এক পাশে এলোমেলো করে রাখা বেঞ্চ। মিলনায়তনে চলছে আলোকসজ্জার কাজ। আর ভেতরের এক পাশে হচ্ছে রান্না। কলেজের এক কর্মচারীর ছেলের বিয়ের আয়োজন চলছে। অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আইয়ুব ভূইয়া প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সন্তানের বিয়ের এই অনুষ্ঠান আগেই নির্ধারণ করা ছিল। মানবিক কারণে ছাড় দিতে হয়েছে। তবে রাতের মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাক করা হবে। আজ ক্লাস শুরুর জন্য বাকি সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে।

এই কলেজে দুটি আবাসিক ছাত্রাবাসে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী থাকার ব্যবস্থা আছে। অধ্যক্ষ জানালেন, একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪ সেপ্টেম্বর এবং দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর ছাত্রাবাস খোলা হবে। সবাইকে করোনার আরটিপিসিআর পরীক্ষা করিয়ে আসতে হবে। ডাইনিং রুমে বসে আপাতত খাওয়া যাবে না।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর প্রথম কাজটি হতে হবে সব শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর বিদ্যালয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। এ জন্য সবার আগে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে পড়াশোনায় অভ্যস্ত করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার এই কার্যক্রমে শিক্ষাপ্রশাসনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগকেও একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে যেসব বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো খুবই ভালো। কিন্তু এগুলো যথাযথভাবে মানতে হবে। আর শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের করোনা পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক করোনার পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন