বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
নিবন্ধন করে টিকার অপেক্ষায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ। সরকারের হাতে টিকা আছে ৭০ লাখের মতো, যা থেকে দ্বিতীয় ডোজের জন্য রাখতে হবে। ১২ আগস্টের মধ্যে ৩৪ লাখ টিকা আসবে, বলছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা।

সাভারের বাসিন্দা শামসুন্নাহার উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন গত ১৪ জুলাই। ২৬ দিন পার হয়েছে, গতকাল বিকেল পর্যন্ত তিনি জানতে পারেননি কবে টিকা পাবেন। তাঁর মুঠোফোনে কোনো খুদে বার্তা যায়নি।

সারা দেশে এ রকম বহু উদাহরণ আছে। কেউ করোনার টিকার প্রথম ডোজের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন দ্বিতীয় ডোজের জন্য। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এর কোনো সমাধানের কথা জানা যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যেসব কেন্দ্রে দৈনিক টিকাদানের সক্ষমতার তুলনায় নিবন্ধন বেশি, সেসব কেন্দ্র থেকে খুদে বার্তা পেতে বিলম্ব হচ্ছে।

সমস্যা বড় হচ্ছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাবে, ৪ আগস্ট পর্যন্ত করোনার টিকার জন্য প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন। এক দিন পর নিবন্ধনের সংখ্যা আরও প্রায় ১০ লাখ বেড়ে যায়। গত সপ্তাহের শেষ দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট নিবন্ধন করে টিকার অপেক্ষায় থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৫ লাখ।

দেশে গত শুক্রবার করোনার টিকাদান বন্ধ ছিল। টিকাদান ও নিবন্ধনের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গণমাধ্যমে পাঠায়নি। এক দিন বিরতির পর শনিবার দেখা যায় নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ। ওই দিন প্রথম আলোর এক সংবাদে বলা হয়েছিল, প্রতি মিনিটে (শনিবার) ৫ হাজার মানুষ করোনা টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন।

করোনার টিকার নিবন্ধন বেড়ে যাওয়ার কারণ তরুণ জনগোষ্ঠীকে সুযোগ দেওয়া। এ বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে যখন প্রথম টিকার নিবন্ধন শুরু হয়। তখন বলা হয়েছিল, ৫৫ বছরের বেশি বয়সী এবং নানা পেশার সম্মুখসারির কর্মীরা আগে নিবন্ধনের সুযোগ ও টিকা পাবেন। এরপর ক্রমান্বয়ে বয়সসীমা কমতে থাকে, বিভিন্ন সময় বয়সসীমা কমিয়ে ৪০, ৩৫, ৩০ ও ২৫ বছর করা হয়। সর্বশেষে বলা হয়েছে, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী যে কেউ করোনার টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন।

বয়সসীমা কমিয়ে আনার সঙ্গে নিবন্ধন দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কারণেও নিবন্ধন বেড়েছে। গত শনিবার থেকে করোনার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। যদিও সরকার বলেছিল, সম্প্রসারিত টিকাদান কেন্দ্রে টিকা নিতে নিবন্ধন প্রয়োজন হবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে এনে কেন্দ্র থেকে টিকা নেওয়া যাবে।

আগে নিবন্ধন করা অনেক মানুষ ৭ ও ৮ আগস্ট সম্প্রসারিত টিকাদান কেন্দ্র থেকে টিকা নিয়েছেন। কিন্তু এঁদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। ১২ আগস্ট পর্যন্ত এই বিশেষ কর্মসূচি চলবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এই নিবন্ধন করা মানুষকে টিকা দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ টিকাদানের দ্বিতীয় দিন

করোনার টিকাদানের সম্প্রসারিত কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল। প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও রাজধানী বেশ কিছু কেন্দ্রে ভিড়ের পাশাপাশি অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েছে। অনেক মানুষ টিকা না নিয়ে ফিরে গেছেন। তবে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

টিকার জন্য গতকাল সকাল সাতটায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জিনা বেগম। উত্তর সিটির বাসিন্দা হওয়ায় সকাল ১০টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গেলেন। দক্ষিণ সিটির আওতাধীন ধানমন্ডি ৮/এ নম্বরে ডিঙি রেস্টুরেন্টের পাশে টিকাকেন্দ্রের ঘটনা এটি। আর্জিনার মতো অনেকেই অন্য ওয়ার্ড বা উত্তর সিটির বাসিন্দা হওয়ায় টিকা নিতে গিয়ে ফিরে যান। ওয়ার্ডের বাইরের বাসিন্দাদের টিকা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে হইচই হওয়ায় এ কেন্দ্রে দেরিতে টিকা দেওয়া শুরু হয়।

ডিঙি রেস্টুরেন্টের পাশের কেন্দ্রে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ের পাশে তাঁবু টাঙিয়ে টিকার বুথ করা হয়। এ কেন্দ্রে টিকা কার্যক্রমে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক সহযোগিতা করছে। ওই কেন্দ্রে গিয়ে গতকাল সকালে দেখা যায়, টিকা কারা পাবেন, কারা পাবেন না, তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে রয়েছেন আগ্রহীরা। কেন্দ্রের টিকার পরিমাণ দিনে ৩৫০ ডোজ। কিন্তু উপস্থিত মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। বৃষ্টি শুরু হলেও অনেকে লাইন ছেড়ে যাননি।

টিকা নিতে আসা বেশির ভাগ মানুষ জানান, তথ্যের ঘাটতির কারণে তাঁরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেন্দ্রের সামনে উল্লেখ করা উচিত ছিল কারা এখানে টিকা পাবেন। এ বিষয়ে ব্র্যাকের স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির পরিচালক মোর্শেদা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নিবন্ধন করে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁরা যে ওয়ার্ডে নিবন্ধন করেছেন সে ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গেলে টিকা পাবেন।

এই কেন্দ্রে বয়স্কদের জন্য আলাদা লাইন ছিল না। তবে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা একজন দাবি করেন, স্বেচ্ছাসেবকেরা বয়স্কদের দেখলে সামনে নিয়ে আসেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ ডোজের বেশি টিকা দেওয়া হয়। তবে লাইনে তখনো দ্বিগুণ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছিল না।

টিকা কত আছে

দেশে গতকাল পর্যন্ত ১ কোটি ৮৬ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। দেশে এ পর্যন্ত টিকা এসেছে ২ কোটি ৫৬ লাখের মতো। এ হিসাবে এখন সরকারের হাতে টিকা আছে ৭০ লাখের কাছাকাছি। তবে এ টিকা থেকে দ্বিতীয় ডোজ রেখে দেওয়ার একটি বিষয় আছে।

টিকা কিনতে সরকার চীনের সঙ্গে দেড় কোটি ডোজের চুক্তি করেছে। তবে চীন থেকে মোট সাড়ে সাত কোটি ডোজ টিকা আনার কাজ চলছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। আব্দুল মোমেন গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, চলতি মাস ও আগামী মাসে ১ কোটি ৪ লাখ ডোজ টিকা পাবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে এ মাসেই টিকার বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে আসবে চীনের সিনোফার্মের ৩৪ লাখ টিকা। কোভ্যাক্স পাঠাবে আরও ১০ লাখ অক্সফোর্ড–অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা। আর আগামী মাসে ফাইজারের ৬০ লাখ টিকা আসবে। এ টিকাও পাঠাবে কোভ্যাক্স।

সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এই যে এখন টিকা চাহিদা অনুযায়ী নেই। তবে আগামী দিনগুলোতে আসবে বলে আশা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, কোভ্যাক্সের মাধ্যমে সিনোফার্মের ৩৪ লাখ টিকা দেশে আসবে ১২ আগস্টের মধ্যে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন