নিয়োগবিধি ও নীতিমালা তৈরি না করেই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ১০ জন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা গতকাল বৃহস্পতিবার শপথ নিয়েছেন। বিধিমালা তৈরির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বিধির একটি খসড়া রেখে গেছেন বলে জানিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে সংবিধান অনুযায়ী একটি আইন করার বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে ইতিমধ্যে কিছু বিচারক নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। তাই আইনের জন্য অপেক্ষায় না থাকার পরামর্শ আমি গ্রহণ করেছি।’
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতিমালা না করে এভাবে বিচারক নিয়োগ দেওয়া অনিচ্ছাকৃত নয়। আইনমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তিনি ওই নীতিমালা হচ্ছে-হবে-করব বলছেন। অথচ রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা মাত্র দুই ঘণ্টার কাজ।’ তাঁর কথায়, নিজেদের মতো করে শূন্যতা পূরণ করার পর তাঁরা হয়তো আইন করবেন, ভবিষ্যতে যাতে অন্যরা অসুবিধায় পড়েন।
গত বুধবার খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন যুক্ত বিবৃতিতে আইন না করে নতুন করে হাইকোর্টে ১০ জন অতিরিক্তি বিচারক নিয়োগ দেওয়াকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে বর্ণনা করেন।
আইনমন্ত্রী অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, বিচারক অপসারণে অভিশংসনের যে বিধান ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা হয়েছে, তা কার্যকর করতে দ্রুত একটি আইন দরকার। আর এটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই আইনের খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো হবে। এর পরই বিচারক নিয়োগ আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বিচারক অপসারণে আইন না করা হলে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংশোধিত ৯৬ অনুচ্ছেদটি অকার্যকর থাকবে। আর বিচারক নিয়োগে নীতিমালার পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করা সমীচীন হবে।
বিচারক নিয়োগে নীতিমালা করার বিধান বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল না। ১৯৭৮ সালের ২০ আগস্ট জিয়াউর রহমান একটি সামরিক ফরমান দিয়ে সংবিধানে ৯৫(২) গ অনুচ্ছেদ যুক্ত করে নীতিমালার বিধান আনেন। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকলে তিনি বিচারক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।’ কিন্তু গত ৩৭ বছরে এ আইন করা হয়নি।
এ ব্যাপারে বিএনপির ব্যর্থতার বিষয়ে মন্তব্য চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমি বিএনপির ব্যাপারে বলতে পারব না। তবে সরকারে যে-ই থাক, সংবিধানে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আইন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের আমল থেকে হাইকোর্টের নবনিযুক্ত বিচারকদের সংবর্ধনা জানানোর রীতি বার থেকে স্থগিত করা হয়। সেটা এখনো চলছে। এটা কারও যোগ্যতা বা দক্ষতার প্রশ্নে নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে আমরা এই সিদ্ধান্ত মেনে চলছি।’
২০০৮ সালের ১৭ জুলাই বিএনপি আমলে বাদ পড়া ১০ বিচারকের পুনর্নিয়োগ মামলার রায়ে হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ (বিচারপতি আবদুর রশীদ, এস কে সিনহা, নাজমুন আরা সুলতানা ও সৈয়দ জিয়াউল করিম সমন্বয়ে গঠিত) অভিমত দিয়েছিলেন, ‘বিচারক নিয়োগে গাইডলাইনের অনুপস্থিতি বিনা উদ্দেশ্যে নয় বরং সুচিন্তিত হতে পারে।’ এর পরে একই মামলায় আপিল বিভাগ (বিচারপতি এম এম রুহুল আমীন, মোহাম্মদ ফজলুল করিম, মো. তাফাজ্জাল ইসলাম, মো. জয়নুল আবেদীন এবং এম এ মতিন সমন্বয়ে গঠিত) ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিচারক নিয়োগে প্রথমবারের মতো একটি গাইডলাইন করে দেন। এতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির পরামর্শ নেবেন এবং তাঁরা পরস্পর চিঠিপত্রের মাধ্যমে বা টেবিলে বসে পরামর্শ করতে পারেন। কিন্তু এই শলাপরামর্শের প্রক্রিয়াকে অধিকতর স্বচ্ছ করতে তাঁদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার রেকর্ড রাখতে হবে, যাতে বিরোধ বা মতানৈক্য দেখা দিলে কোনো দ্ব্যর্থকতা ছাড়াই তা নিরসন করা যায়।’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বুধবারের বিবৃতিতে আইন ও গাইডলাইন দুটিই চেয়েছে। গত চার বছরে আপিল বিভাগের ওই গাইডলাইনের বাস্তবায়ন সম্পর্কে মন্তব্য চাইলে সুপিম কোর্ট বারের সভাপতি বলেন, চলমান বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া আপিল বিভাগের ওই গাইডলাইনের পরিপন্থী।
ওই গাইডলাইন সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগসংক্রান্ত দুটি মামলা অনিষ্পন্ন আছে। ২০১০ সালের ৬ জুন বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বিচারকের প্রার্থিতা বাছাইয়ে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, তা রাষ্ট্রকে জানাতে চার সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু গত চার বছরেও সরকার তার উত্তর দেয়নি।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন