বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যের দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত নেই

২০২০ সালে করোনাকালে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই সময়ে একেবারেই নির্বিকার ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। সমালোচনার মুখে এ বছর কিছুটা সক্রিয় হয় স্বাস্থ্যের সংসদীয় কমিটি। তবে দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিয়ে সংসদীয় কমিটি কোনো তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জায়গা হলো সংসদীয় কমিটি। কিন্তু কমিটিগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে তা হচ্ছে না।

চলতি বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। কমিটি সূত্র জানায়, কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য তিনি কয়েক মাস দেশের বাইরেও ছিলেন। এ কারণে এই কমিটির বৈঠক করা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিটিগুলোর সভাপতিদের অনেকে বয়োজ্যেষ্ঠ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় অনেকে বৈঠক করেননি। আবার কয়েকটি কমিটির সভাপতি মৃত্যুবরণ করায় পদটি অনেক দিন শূন্য ছিল। বৈঠক কম হওয়ার এটি একটি কারণ, কিন্তু এর আগে স্বাভাবিক সময়েও যে সব কমিটি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, তা নয়।

সংসদ সচিবালয় থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছর সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় ছিল খাদ্য, জনপ্রশাসন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং শিল্প মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এই কমিটিগুলো বৈঠক করেছে একটি করে। দুটি করে বৈঠক করেছে অর্থ, ভূমি, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি।

বৈঠক কম কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ভূমি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বৈঠক কম হয়েছে। কয়েকটি বৈঠক ডেকে পেছাতে হয়েছে। তিনি নিজেও একটি বৈঠক করার পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। ভূমিমন্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর তাঁরা দুটি বৈঠক করতে পেরেছেন।

এ বছর সাতটি বা তার বেশি বৈঠক করেছে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক আটটি কমিটি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১১টি বৈঠক করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। গত বছরও এই কমিটির বৈঠক ছিল সবচেয়ে বেশি।

সদস্যদের উপস্থিতিও কম

সংসদীয় কমিটিগুলোর বৈঠক যেমন কম হচ্ছে, তেমনি অনেক কমিটিতে সদস্যদের উপস্থিতিও কম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ ডিসেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক ছিল। এই কমিটির ১০ সদস্যের মধ্যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৩ জন। পরে বৈঠকটি মুলতবি করা হয়। ২৩ ডিসেম্বর মুলতবি বৈঠকে অংশ নেন পাঁচজন। একই দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাত্র তিনজন। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রতিটি সংসদীয় কমিটির সদস্য ১০ জন করে। চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ১৯টি কমিটির বৈঠকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৮টি কমিটির বৈঠকে উপস্থিতি ছিল ৬-এর কম। এর মধ্যে কোনো কমিটিতেই ১০ সদস্যের সবাই কোনো বৈঠকে ছিলেন না।

সংসদীয় কমিটির কাজ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে অনিয়ম–দুর্নীতি তদন্ত করা। মন্ত্রণালয়ের টাকায় বিদেশ সফর করা বা মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ কোনো সুবিধা নেওয়া কমিটির স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হলেও এখনো তা বন্ধ হয়নি।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়কে বিদেশ সফরের আয়োজন করার সুপারিশ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এ জন্য অর্থ বিভাগের কাছে চার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম দেখতে কমিটির সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কমিটিকে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করেছিল, কমিটির সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দৃষ্টিনন্দন করা হোক। এসব বিদ্যালয়ে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতেও প্রাধিকার চেয়েছেন তাঁরা। সংসদীয় কমিটির সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় রেলওয়ের উন্নয়নকাজ তদারকির ব্যবস্থা করতে বলেছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি।

সংসদ বিষয়ে গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কোনো বিশেষ সুবিধা নেওয়া সাংঘর্ষিক। সংসদীয় কমিটির বিদেশ সফরের জন্য সংসদ সচিবালয় আলাদা বরাদ্দ রাখতে পারে।

সংসদীয় কমিটির নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে এই অধ্যাপক বলেন, কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। যেখানে সংসদ কার্যকর হবে না, সেখানে সংসদীয় কমিটিগুলোও কার্যকর হবে না। অতীতে বিভিন্ন সংসদের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলোকে তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটিতে যখন প্রায় সবাই সরকারি দলের সদস্য হন, তখন ‘ক্রিটিক্যাল’ আলোচনা বা নীতি পর্যালোচনা হয় না। বিরোধী দল এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী হলে সংসদের মতো সংসদীয় কমিটিও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন