default-image

গোলগাছটা যেন বৈপরীত্যে ভরা। নাম তার ‘গোল’ অথচ পাতাগুলো সব নারকেল পাতার মতো লম্বা। নোনাজল-মাটি ছাড়া গোল হয় না। গোলগাছের শরীরজুড়েও নোনতা স্বাদ। কিন্তু এই গাছেই মজুত থাকে সুমিষ্ট গাঢ় রস। এই রস জ্বালিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু গুড়। উপকূলের কৃষকেরা প্রাচীনকাল থেকেই গোলগাছের এই রস দিয়ে গুড় তৈরি করে আসছেন। এখন সেটা বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে। শুধু গুড় নয়, গোলগাছের পাতা, ডাঁটা—কোনো কিছুই ফেলনা নয়। গোলপাতায় ঘরের ছাউনি, ডাঁটা দিয়ে চাটাই, ঘরের বেড়া, এমনকি জ্বালানির কাজে ব্যবহৃত হয়।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি-বনায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আলমগীর কবির জানান, পাম গোত্রের এই উদ্ভিদ যেমন পরিবেশসহায়ক, তেমনি এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ভূমিক্ষয়, ভাঙন, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি এই উদ্ভিদ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষায় বায়ুর গতিরোধক (উইন্ডব্রেকার) হিসেবেও কাজ করে।

গোলগাছের গুড় তৈরি করে এখন ভালো আয় করছেন সাগরতীরের বরগুনার তালতলী এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার অনেক কৃষক। গোলগাছ চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক লাগে না। এর কোনো পরিচর্যাও লাগে না। এমনকি গুড় তৈরি, সংরক্ষণে কোনো রাসায়নিকও ব্যবহৃত হয় না।

বিজ্ঞাপন

রস সংগ্রহ হয় যেভাবে

লবণাক্ত পলিযুক্ত মাটিতে জন্মানো গোলগাছের কাণ্ড থেকে রস বের করার কৌশলটি অদ্ভুত। তালতলী বেহালা গ্রামের চাষি দিলীপ কুমার হাওলাদার জানান, আষাঢ় মাসে গোলগাছের কাণ্ডে ফল ধরে। স্থানীয়ভাবে এই গোল ফলকে ‘গাবনা’ বলা হয়। অগ্রহায়ণে ফল ধরার পর এর কাণ্ডটি ভারে কিছুটা নুয়ে পড়ে। এরপর কাণ্ডটিকে আলতো করে টেনে নুইয়ে মাটির কাছাকাছি নিয়ে নিচ থেকে টানা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এরপর পৌষের শুরুতে নোয়ানো এই কাণ্ড পা দিয়ে আলতো করে ৫ থেকে ৭ মিনিট ধরে মালিশের মতো করে দিতে হয়। একে স্থানীয় ভাষায় ‘দোয়ানো’ বলে। এতে গাছের রস ওই কাণ্ডে জমা হয়। ১৫ দিন ধরে এভাবে দোয়ানোর পর একদিন কাণ্ড থেকে ফলটি কেটে ফেলা হয়। প্রক্রিয়াটি এখানেই শেষ নয়। এরপর রস পেতে অপেক্ষা করতে হয় আরও অন্তত ১০ দিন। ফল কাটার পর কাণ্ডটিকে তিন দিন শুকাতে সময় দিতে হয়। তিন দিন পর কাণ্ডের মাথার দিকে পাতলা করে চেঁছে দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ ধরে চাঁছার পর কাণ্ডের মাথা থেকে বের হতে থাকে সুমিষ্ট আর গাঢ় রস। ছোট ছোট হাঁড়ি বা ঘট বেঁধে সে রস সংগ্রহ করেন চাষিরা। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা করে হাঁড়িতে জমা রস সকালে সংগ্রহ করে উনুনে জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি করা হয় গোলের গুড়। পৌষ থেকে ফাল্গুন—তিন মাস ধরে এভাবে চলে রস সংগ্রহ আর গুড় তৈরির কাজ।

প্রতিটি গোলগাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে চার কলসি রস পাওয়া যায়। প্রতি কলসি রস জ্বাল দিয়ে প্রায় চার কেজি গুড় পাওয়া যায়। এভাবে মৌসুমে দিনে দেড়-দুই হাজার টাকা আয় হয়।
চাষিরা

চাষিরা জানান, প্রতিটি গোলগাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে চার কলসি রস পাওয়া যায়। প্রতি কলসি রস জ্বাল দিয়ে প্রায় চার কেজি গুড় পাওয়া যায়। এভাবে মৌসুমে দিনে দেড়-দুই হাজার টাকা আয় হয়।

তালতলী উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, উপজেলায় ১২০ হেক্টর জমিতে গোলগাছের আবাদ হচ্ছে। এতে অন্তত ২৫ হাজার গোলগাছ রয়েছে। উপজেলায় বছরে অন্তত ১০ হাজার কেজি গুড় উৎপাদিত হয়। আর কলাপাড়ায় গোল চাষের সঙ্গে দুই থেকে আড়াই হাজার কৃষক জড়িত।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন