খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় ঘেরাও করতে যাওয়ার পথে নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মিছিলে গতকাল সোমবার ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মিছিলকারীরা গুলশান ২ নম্বর মোড়ের একটি শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর করেন। এর কিছুক্ষণ পর গুলশান মোড় থেকে নতুন বাজারমুখী সড়কে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। তবে এতে কেউ হতাহত হননি।
পুলিশ মিছিলটি খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের অদূরে ৮৬ নম্বর সড়কের মাথায় আটকে দেয়। সেখানেই তাঁরা সমাবেশ করেন। হরতাল-অবরোধের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ গতকাল ঘেরাওয়ের এ কর্মসূচি দেয়। এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সমন্বয় পরিষদের অধীন বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে লোকজন সকাল থেকে গুলশান পার্কে জড়ো হন। এতে রাজধানীর আশপাশের এলাকার লোকজন বাসে করে আসেন। সমাবেশের কারণে গুলশান গোলচত্বর এলাকার কয়েকটি সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
গতকাল খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অবস্থানরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাইরে থেকে কোনো খাবার যায়নি দিনভর এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে। বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শাইরুল কবির খান প্রথম আলোকে রাতে এ তথ্য জানান।
মিছিলের আগে গুলশান সেন্ট্রাল পার্কে সমাবেশ হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘেরাও করতে এসেছি। কারণ, উনি ঘুমিয়ে থাকেন। আর ওনার লোকেরা সাধারণ মানুষকে হত্যা করেন। আমরা এর প্রতিবাদ করতে এসেছি।’
বিএনপির চেয়ারপারসনকে ‘দানব’ অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি নৌমন্ত্রী দাবি জানান, ‘অবিলম্বে এই দানবকে বন্দী করতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। তা না করলে খালেদা জিয়াকে জনগণই আটক করে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাবে।’
সমাবেশ শেষে দুপুর ১২টার দিকে নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বে সমন্বয় পরিষদের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী মিছিল নিয়ে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় ঘেরাও করতে রওনা দেন। মিছিল শুরুর আগে নৌমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ ভাইয়েরা আমাদের যত দূর যেতে দেবে, তত দূর পর্যন্ত যাব। আমরা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে যাব। তবে আমাদের কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ।’
আধা ঘণ্টা পর মিছিলটি খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের অদূরে ৮৬ নম্বর সড়কের মাথায় পৌঁছায়। পুলিশ সেখানে মিছিল আটকে দেয়। মিছিলকারীরা সেখানে অবস্থান নিয়ে খালেদা জিয়া এবং হরতাল-অবরোধবিরোধী নানা স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় সেখানে ১৪ দলের নেত্রী শিরিন আখতার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হেলাল মোর্শেদ খান, মুক্তিযোদ্ধা সম্মিলিত ফ্রন্টের মহাসচিব মাহবুব আলম চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। পরে নৌমন্ত্রী ১৮ ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ট্রাকমিছিল, ১৯ ফেব্রুয়ারি মতিঝিল থেকে জাতীয় পতাকা মিছিল করার কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
সন্ধ্যায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য জনসংযোগ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খান বিবৃতিতে জানান, গুলশানে বোমা হামলার প্রতিবাদে বিকেল সাড়ে চারটায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে সংবাদ ব্রিফিং হয়। সেখানে বোমা হামলার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভের কর্মসূচি দেওয়া হয়।
খালেদা জিয়া গত ৩ জানুয়ারি থেকে তাঁর গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আছেন। নৌমন্ত্রী গুলশান থেকে খালেদা জিয়ার কার্যালয় সরিয়ে নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানান।
মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণ: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে সোয়া ১২টার দিকে মিছিলটি গুলশান ২ নম্বরে মেট্রোপলিটন শপিং প্লাজার সামনে এলে মিছিলে হঠাৎ একটি ককটেল বিস্ফোরণ হয়। নেতা-কর্মীরা ছোটাছুটি শুরু করেন। শপিং প্লাজার দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্লাজার সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় কয়েকজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মিছিলের কয়েকজন অভিযোগ করেন, মেট্রোপলিটন প্লাজার ওপর থেকে এক নারী ককটেল ছুড়েছেন। ক্ষুব্ধ কর্মীরা শপিং প্লাজার বন্ধ দোকানের দরজায় লাঠিসোঁটা দিয়ে বাড়ি মারেন ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে কয়েকটি দোকানের কাচ ভেঙে যায়। প্লাজার সামনে থাকা কয়েকটি মোটরসাইকেল রাস্তায় ফেলে ভাঙচুর করা হয়। প্লাজার দুটি কলাপসিবল ফটকে তালা ঝুলিয়ে ভেতরে অবস্থান নেন নেতা-কর্মীরা। তাঁরা ভেতরে ককটেল নিক্ষেপকারী নারীকে খুঁজে দিতে দোকানিদের চাপ দেন। দোকানিরা তাঁদের জানান, কোনো নারীকে তাঁরা দেখেননি। একপর্যায়ে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য জনসংযোগ কর্মকর্তার ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ওই ককটেল হামলায় ১৮ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, আটজনকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে, চারজনকে সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও একজনকে হলি ফ্যামিলিতে ভর্তি করা হয়েছে।
তবে প্রথম আলোর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিনিধি জানান, ওই হামলার ঘটনায় বাবুল আহমেদ (৫৪), মোতালেব খালাসি (২২) ও তাঁর খালাতো ভাই ওবায়দুল খালাসি (২০) নামের তিনজন চিকিৎসা নেন। তাঁদের পায়ের বিভিন্ন জায়গায় স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়।
বাবুল সাংবাদিকদের জানান, ভবনের ওপর থেকে কে বা কারা ককটেল ছুড়ে মারে। তিনি শ্রমিক লীগের কর্মী।
আহত মোতালেব ও ওবায়দুল দুজনই ভ্রাম্যমাণ পোলাওয়ের চাল বিক্রেতা। তাঁদের দাবি, হরতাল-অবরোধের কারণে তাঁরা ব্যবসা করতে পারছেন না বলে শাজাহান খানের প্রতিবাদ সভায় গিয়েছিলেন।
সন্ধ্যায় নৌমন্ত্রী শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে এ সমাবেশ হয়নি। এমনকি দলীয় নির্দেশেও তা করা হয়নি। টানা অবরোধ ডেকে খালেদা জিয়া যা করছেন, তা পাগলামি। তাঁকে এটা বন্ধ করতে হবে। অবরোধ প্রত্যাহারে তাঁকে বাধ্য করা হবে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আরও বড় পরিসরে কর্মসূচি দেওয়া হবে।
বেলা পৌনে একটার দিকে গুলশান ২ নম্বর থেকে নতুন বাজারমুখী সড়কে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সরকারপন্থী নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। ককটেল দুটি পাশের নির্মাণাধীন একটি ভবনের ওপর থেকে ছোড়া হয়েছে অভিযোগ করে নেতা-কর্মীরা ভবনটির টিনের সীমানা বেড়া ভাঙতে শুরু করেন। পরে পুলিশ তাঁদের নিবৃত্ত করে।
এদিকে বেলা পৌনে ১১টায় মহিলা আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা-কর্মী খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘেরাও করতে যান। তাঁদেরও ৮৬ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে পুলিশ থামিয়ে দেয়। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের (উত্তর) সভাপতি তসলিমা চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শাহিদা তারেক।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন