বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি এ প্রতিবেদককে মন্ত্রণালয়ের তথ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চিকিৎসকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য রাখতে চাই না। তাঁরা আরও ভালোভাবে কাজ করুক, সে জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বৈষম্য নিয়ে কোনো অভিযোগ এলে সেটি দেখব।’

অন্য ক্যাডারের সঙ্গে বৈষম্য

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পদোন্নতির বিধিমালা অনুযায়ী নবম গ্রেডের একজন ক্যাডার কর্মকর্তা তিনটি শর্ত পূরণ করলে সিনিয়র স্কেলে (ষষ্ঠ গ্রেড) পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন, যা একজন বিসিএস কর্মকর্তার প্রথম পদোন্নতি। এ জন্য চাকরি পাঁচ বছর পূর্ণ, চাকরিকাল সন্তোষজনক ও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অনেকেই এসব শর্ত পূরণ করে বছরের পর বছর পদোন্নতি পাচ্ছেন না। ওপরের দিকের পদ খালি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের গ্রেডের উন্নতি হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যদিও প্রশাসন, পুলিশসহ অনেকে ক্যাডারেই উপরিউক্ত তিনটি শর্ত পূরণ করলে ব্যাচ অনুসারে তাঁদের পদোন্নতি হয়। ওপরের পদ খালি না থাকলেও আগের পদে রেখেই গ্রেড পরিবর্তন বা পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। যেমন ৩৩তম বিসিএসে যোগ দেওয়া প্রশাসন বা পুলিশের মতো ক্যাডারের কর্মকর্তারা ষষ্ঠ গ্রেড বা সিনিয়র স্কেলে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু একই বিসিএসের চিকিৎসকেরা সব শর্ত পূরণ করেও নবম গ্রেডেই রয়েছেন ওপরের দিকে পদ খালি না থাকায়।

‘যথাসময়ে পদোন্নতি না হওয়ার কারণে যতটা না আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হই, তার চেয়ে বেশি মর্যাদাসংকটে ভুগি।’
মো. সাইফুল ইসলাম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) কর্মরত চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যথাসময়ে পদোন্নতি না হওয়ার কারণে যতটা না আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হই, তার চেয়ে বেশি মর্যাদাসংকটে ভুগি।’

মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, স্বাস্থ্য ক্যাডারে মোট কর্মকর্তা আছেন ৩২ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১৫ হাজারই নবম গ্রেডে।

২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএসে যোগ দিয়ে এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার তৌফিক আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ৩৩তম বিসিএসে ৬ হাজার ৩৩ জন চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে তাঁদের বড় অংশ বিভাগীয় পরীক্ষা, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, সন্তোষজনকভাবে চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ ও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাস করেছেন। অথচ মাত্র ৩৯ জন গত জুনে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা শতকরা ১ ভাগও নয়। অথচ একই বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন।

পদোন্নতিতে ডেন্টাল সার্জনদের অবস্থা আরও শোচনীয়। তাঁদের পদোন্নতির সংখ্যা খুব কম। ২৬ বছর ধরে চাকরি করে অনেকে এখনো শুরুর পদ নবম গ্রেডেই রয়ে গেছেন। ১৯৯৪ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া ১৩তম বিসিএসের একজন ডেন্টাল সার্জন বলেন, তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়া অন্য ক্যাডারের অনেকে তৃতীয় গ্রেডে চলে গেছেন। অথচ তিনি নবম গ্রেডেই রয়ে গেছেন। তাঁর চেয়ে ২৬ ব্যাচের ছোট (৩৯তম বিসিএস) কর্মকর্তাও একই গ্রেডে আছেন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের মতে, স্বাস্থ্য ক্যাডারে যেসব বৈষম্য আছে, তা দূর করতে হবে। অন্যথায় চিকিৎসকদের হতাশা দূর করা যাবে না। এই হতাশা ভালো ফল বয়ে আনবে না।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের মতে, স্বাস্থ্য ক্যাডারে যেসব বৈষম্য আছে, তা দূর করতে হবে। অন্যথায় চিকিৎসকদের হতাশা দূর করা যাবে না। এই হতাশা ভালো ফল বয়ে আনবে না।

সর্বশেষ কয়েকটি বিসিএসের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অনেক চিকিৎসক স্বাস্থ্য ক্যাডারে না গিয়ে অন্য ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন। ৩৬তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যিনি প্রথম হন, তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস পাস করেন। সর্বশেষ ৩৮তম বিসিএসে সাতজন চিকিৎসক পররাষ্ট্র ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন। তাঁদের দুজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদোন্নতি খুবই ধীরগতি। তাই তাঁরা পররাষ্ট্র ক্যাডার বেছে নিয়েছেন।

নিজ ক্যাডারেও বৈষম্য

স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক পদগুলোয় পদোন্নতির জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান-সংক্রান্ত উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাস করলেই পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য হন। এসব পদ থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা থেকে সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক ও কদাচিৎ অতিরিক্ত মহাপরিচালক পর্যন্ত যেতে পারেন।

এ ছাড়া চিকিৎসকদের বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতির ক্ষেত্রে রয়েছে ক্লিনিক্যাল, বেসিক, প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়। এসব বিষয়ে পদোন্নতির জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে; একই সঙ্গে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক। সব শর্ত পূরণ করলে নবম গ্রেডের মেডিকেল অফিসার থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে সহকারী অধ্যাপক বা জুনিয়র কনসালট্যান্ট হওয়া যায়।

কিন্তু এখানে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি বৈষম্য প্রকট। কোনো কোনো বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করেও ২০০৫ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ২৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা এখনো নবম গ্রেডের মেডিকেল অফিসার। আবার কোনো কোনো বিষয়ে ২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেছেন।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক মো. লুৎফর রহমান আজাদ গত বছরের ২৮ নভেম্বর ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখান। তাতে দেখা গেছে, গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি ২০০৩ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ২১তম বিসিএস পর্যন্ত এসে আটকে গেছে। অর্থাৎ ২২তম থেকে ৩৩তম বিসিএসের কেউ এখনো সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাননি। একইভাবে মেডিসিন, সার্জারি, কার্ডিওলজি, চর্ম ও যৌন, কমিউনিটি মেডিসিন, ইউরোলজি বিভাগের ক্ষেত্রে ২০০৬ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ২৫তম বিসিএস পর্যন্ত পদোন্নতি হয়েছে। এর পরবর্তী ব্যাচের চিকিৎসকেরা এখনো সহকারী অধ্যাপক হতে পারেননি। অন্যদিকে, ২০১২ সালে ৩০তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্তরা ফিজিক্যাল মেডিসিন এবং মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্য ক্যাডারের মতো ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি না থাকার কারণে এমন অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতির এই সমস্যা শিক্ষা ক্যাডারেও রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য ক্যাডারের ১৭তম থেকে ৩৩তম বিসিএসের ১ হাজার ২০০ জন কর্মকর্তা তিনটি শর্ত পূরণ করে সিনিয়র স্কেলে (ষষ্ঠ গ্রেড) পদোন্নতির জন্য গত বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তাঁদের একজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন অন্তর্বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক নীহার রঞ্জন দাশ জানান, সব ধরনের যাচাই-বাছাই শেষে গত মার্চে তাঁদের ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, বৈষম্যের যত দিক, সবই স্বাস্থ্য ক্যাডারে আছে। এসব বৈষম্য দূর না হলে চিকিৎসকেরা সরকারি চাকরিতে আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।

উচ্চশিক্ষায়ও আটকে যায় পদোন্নতি

সাধারণ ক্যাডারের কর্মকর্তারা উচ্চশিক্ষায় গেলেও তাঁরা সাধারণত ব্যাচ অনুসারে পদোন্নতি পান। এমনকি বিদেশে প্রশিক্ষণ বা পড়াশোনার জন্য প্রেষণে থাকলেও। কিন্তু চিকিৎসকেরা উচ্চশিক্ষায় থাকার সময় পদোন্নতি পান না। শর্ত দেওয়া হয় যে যাঁরা উচ্চশিক্ষায় প্রেষণে আছেন, তাঁরা যেন পদোন্নতির আবেদন না করেন।

ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ উচ্চশিক্ষার জন্য জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত। তিনি জানান, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবছর স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক বিভিন্ন বিষয়ে এমডি বা এমএস এবং ডিপ্লোমা করতে বিএসএমএমইউ বা মেডিকেল কলেজগুলোয় প্রেষণে যান। কেউ কেউ এফসিপিএস করতে যান। তাঁরা সিনিয়র স্কেলে (ষষ্ঠ গ্রেডে) পদোন্নতির সব শর্তপূরণ করা সত্ত্বেও পদোন্নতির আবেদনের যোগ্যতা হারান। যদিও অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত অবস্থায় পদোন্নতি পান।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সরোজ কুমার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসকদের বঞ্চনা থেকে উত্তরণের অন্যতম উপায় লম্বা সময় প্রেষণ বা প্রশিক্ষণে থাকা ব্যক্তিদের পদোন্নতিবঞ্চিত না রাখা। চিকিৎসকেরা যেহেতু প্রেষণে থাকার সময় দেশেই থাকেন ও চিকিৎসাকাজেই নিয়োজিত থাকেন, তাই প্রেষণে বা প্রশিক্ষণে স্বপদে বহাল রেখে পদোন্নতির ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পদোন্নতি পাওয়া একজন কর্মকর্তার অধিকার। দীর্ঘ সময় এই অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন