২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় দগ্ধ ব্যক্তিদের অনেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। যে সহায়তা পেয়েছিলেন খরচ হয়েছে তার কয়েক গুণ। পুরো সুস্থ না হওয়া ব্যক্তিদের কারও কারও দিন কাটছে যন্ত্রণায়। কাজ করতে অক্ষম ব্যক্তিদের কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসাও হচ্ছে না।
ওই সময়ে সহিংসতায় দগ্ধ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এসব তথ্য। তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ জনের সঙ্গে গত শুক্রবার মুঠেফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সাতজনকে পাওয়া গেছে। অন্যদের কারও মুঠোফোন বন্ধ ছিল, কেউ কেউ ফোন ধরেননি।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে কাপ্তাই সড়কের মোড়ে অটোরিকশায় পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছিলেন চালক খোরশেদ আলম (৫০)। তাঁর দুই পায়ের ঊর্ধ্বাংশ, বাঁ হাত, দুই বগল, গলা, পিঠ পুড়ে যায়।
খোরশেদ প্রথম আলোকে জানান, বার্ন ইউনিটে থাকার সময় ২০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন। এরপর কিছু পাননি। বললেন, ‘পঙ্গু হয়ে গেছি। বসতে পারি না। শরীর জ্বলে সব সময়। টাকার অভাবে ওষুধ খাইতে পারি না।’
খোরশেদের আয় না থাকায় পুরো পরিবার পড়েছে দুর্দশায়। তাঁর পরিবার থাকত কুমিল্লা শহরে ভাড়া করা বাসায়। তিনি দগ্ধ হওয়ার পর অর্থাভাবে গ্রামের বাড়ি নাঙ্গলকোটের সিজিয়ারায় চলে গেছে পরিবার। ছেলে মোহাম্মদ আলম বেসরকারি কোম্পানির গাড়ি চালাতেন। বাবাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়িতে সে চাকরিও গেছে। এখন ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে যে বেতন পান, তাতেই কোনোরকমে চলে সংসার। আলম বললেন, ‘কীভাবে যে জীবন চালাব বুঝতে পারি না।’
পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ার কথা জানালেন পুলিশের কনস্টেবল আবুল কালাম আজাদ। এখন কর্মরত গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের পর সন্ধ্যার দিকে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে টেম্পোতে করে ফেরার পথে মহিমাগঞ্জের তুষেরচাই এলাকায় পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হন তিনি। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাইবান্ধা এসে তাঁকে এক লাখ টাকা দেন। এখনো নিজ হাতে ভাত খেতে পারেন না। খাইয়ে দিতে হয়।
আজাদ বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। চিকিৎসায় এ পর্যন্ত খরচ করেছি চার লাখ টাকা। বড় সাহেবদের বলচি। দিমু, দিচ্ছি কর্যায় দিন চল্যা যায়। অ্যাখনও সাহায্য পাইনি।’ তিনি জানান, ডান হাতে আরেকটি অস্ত্রোপচার করাতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন কথা ঠিক না যে আহত পুলিশ সহযোগিতা পায়নি। তবে আমি নতুন। যাঁর কথা বললেন, তাঁর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বিষয়টা দেখব।’
২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে শুরু হয়েছিল সহিংসতা। ২৮ নভেম্বর কর্মস্থল বংশাল থেকে বাসায় ফেরার পথে শাহবাগে বিহঙ্গ পরিবহনের মিনিবাসে পেট্রলবোমা হামলায় শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল বেসরকারি ব্যাংকের চাকুরে মো. শফিকুল ইসলামের। সাত দিন পর বার্ন ইউনিট থেকে ছেড়ে দিলে ভর্তি হন অ্যাপোলো হাসপাতালে। করাতে হয়েছে প্লাস্টিক সার্জারি। চিকিৎসায় খরচ হয় সাড়ে চার লাখ টাকা। সহায়তা বলতে পেয়েছেন বার্ন ইউনিটে থাকাকালীন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘আমার সক্ষমতা আছে খরচ করছি। কিন্তু যাঁদের সামর্থ্য নেই তাঁদের কী অবস্থা? বার্ন ইউনিট থেকে ছাড়ার পরের চিকিৎসা আরও জটিল। সরকারের উচিত সেদিকে নজর দেওয়া।’
মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ এহসানুল হাসান একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী। দুই হাত ও মুখমণ্ডল পুড়েছিল। থাকতেন বনশ্রীতে। ভয়ে বনশ্রী ছেড়ে দোকানের কাছে মেসে উঠেছেন। বাইরে যেতেও ভয় পান। বললেন, ‘আর হামলার শিকার হতে চাই না। ২০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলাম। খরচ হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। এখনো ওষুধ খেতে হচ্ছে।’
গুলশানের কালাচাঁদপুরের সোনার গয়নার দোকানের কর্মচারী রেজাউল করিম দগ্ধ হয়েছিলেন মালিবাগ রেলগেটে বাসে। দুই হাত পুড়ে গিয়েছিল। বললেন, ‘এখন কিছু সুস্থ। মোট পেয়েছিলাম ১০ হাজার টাকা। খরচ হয়েছে অন্তত ৫০ হাজার টাকা। নিজেই করেছি। কে সাহায্য করবে?’
পেট্রলবোমায় দগ্ধ বিহঙ্গ পরিবহনের চালক মাহাবুব আলমের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। গত জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন।
২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি বরিশালের উজিরপুরে পিকআপ ভ্যানে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হন শরীফুল ইসলাম। এ পর্যন্ত সাহায্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পেয়েছেন পিকআপের ক্ষতি বাবদ দুই লাখ টাকা। পোড়া দাগ আর যন্ত্রণা নিয়ে কাটছে দিন। বললেন, ‘বাঁ পা থ্যাকা চামড়া নিয়্যা বুকে লাগানো হইছে। খরচ হইছে আড়াই লাখ টাকা। চিকিৎসা ফুরায় নাই। এহন ঢাহা (ঢাকা) যাইতেও ভয় করে।’
নির্বাচনকেন্দ্রিক হামলায় নিহত-আহত ব্যক্তিদের সহায়তা দিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের গঠিত কমিটির দায়িত্বে আছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এসব ভুক্তভোগীর বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, ‘যারা দরখাস্ত দিয়েছে তাদের কাউকে ফেরানো হয়নি। যারা এখনো সহায়তা পায়নি তারা হয়তো আবেদনই করেনি।’
কোনো কোনো আবেদনকারীর সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টি জানালে শাজাহান খান বলেন, ‘সঠিক লোকের হাতে হয়তো আবেদন পড়েনি।’ তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আবেদন করলে কাউকে ফেরানো হবে না।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে যারা হামলাকারী তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ নিয়ে ভুক্তভোগীদের সহায়তা করা যায়। তবে আমাদের বিচারব্যবস্থায় কেবল অপরাধীর শাস্তি হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী তার ক্ষতিপূরণ পায় না।’ তিনি বলেন, অপরাধীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় বিদ্যমান আইনেই সম্ভব। তবে সরকারি তরফে তেমন চেষ্টা তাঁর চোখে পড়েনি।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন