default-image

সরকারি ২৬টি পাটকল বন্ধের পর পাঁচ মাস পার হয়ে গেছে। এখনো ২৩ হাজার বদলি শ্রমিকের পাওনা টাকার খবর নেই। ৮ হাজার দৈনিক শ্রমিক জানেনও না, তাঁরা টাকা পাবেন কি না। স্থায়ী শ্রমিকদের মধ্যে যাঁরা ব্যাংকের চেক পেয়েছেন, তাঁদের নিজস্ব হিসাবের সঙ্গে সরকারের হিসাবের বিস্তর ফারাক। কোথায় তাঁরা নালিশ জানাবেন? কথা ছিল, শ্রমিকের পাওনাদির হিসাব মিলগেটে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু হয়নি। অথচ পাওনা টাকা পেতে জগতের কঠিনতম শর্তটি জুড়ে দিয়েছে সরকার। কলোনির জমি খালি করতে হবে। কোথায় যাবেন শ্রমিকেরা? দীর্ঘ চার দশক ধরে খালিশপুরে, নোয়াপাড়ায়, ষোলশহরে, ডেমরায় বসত গড়েছেন যে শ্রমিক, তাঁর আসল বাড়ি কোথায়?

কলোনির বহুতল দালানগুলো মিল কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছে। তবে একই জমিতে শ্রমিকেরা নিজেরাও শত শত টিনশেড ঘর তুলেছেন। গার্মেন্টস কর্মীদের মতো ঠাসাঠাসি করে ৮-১০ জন মিলে থাকতে হয়নি তাঁদের। ঘরগুলো গড়া হয়েছে বহু বছর ধরে তিল তিল করে। বসার ঘর আছে, শোবার ঘর আছে; আলাদা রান্নাঘর, বারান্দা আছে। সারবাঁধা ঘরগুলোর সামনে লাউয়ের মাচা, লেবুগাছ, ধনিয়া-পুদিনার আবাদ। জালানার গ্রিল ঘেঁষে হাসনাহেনার গাছ। ঘরের ভেতরে স্টিলের আলমারি, কাঠের সোফা, ড্রেসিং টেবিল। সরকারি মিলের চাকরি, তাই কিছুটা সম্মানের জীবন।

বিজ্ঞাপন
default-image

শ্রমিকদের মনে আশা ছিল, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মিল খুলবে। আবার নতুন করে চাকরিতে ঢুকবেন তাঁরা। অথচ এখন নিজেদের হাতে গড়া ইটের ঘর থেকে ইট খুলে নিতে হচ্ছে। শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজের ঘরের প্রতিটি ইট খুলে নিতে ঠিক কেমন লাগে?

কলোনির রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সারবাঁধা ভ্যানগাড়ি, ঠেলাগাড়ি। শত শত শ্রমিক কলোনি ছাড়ছেন। বাঁশ, কাঠ আর টিনের চাল খুলে রাখছেন। একদিকে স্তূপ করা খাটের পায়া, লেপ-তোশক, তক্তা। ছাদ থেকে খুলে নেওয়া সিলিং ফ্যান, পড়ার টেবিল। আহা রে! চলে যাওয়ার সময় এক বৃদ্ধ শ্রমিক ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। মিলও গেছে, ঘরও গেছে। কয়েক দশকের বসতভিটা থেকে এভাবে জোর করে বের করে দেবে, তা–ও আবার পাওনা টাকা পরিশোধ না করেই—এটা তো শতভাগ বেআইনি কাজ! শ্রম আইনের ৩২ ধারায় স্পষ্ট করে বলা আছে, পাওনাদি পরিশোধ না করে কোনো অবস্থাতেই শ্রমিককে তাঁর বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এভাবে নিজের আইন নিজে ভাঙার শাস্তি সরকারকে দেবে কে?

গোটা দশক ধরে ‘কর্মসংস্থানহীন উন্নয়ন’ করে গেছে সরকার। ওদিকে অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে চীন-ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ সবার ওপরে।

ইটগুলো খুলে রাস্তার ধারে গুছিয়ে রাখছে শ্রমিক পরিবারগুলো। সব হারিয়ে ফকির হয়ে যাওয়া পাটকলের শ্রমিকের কাছে এই শ খানেক ইটের মূল্য কত, তা কি শুধু টাকার অঙ্কে বোঝা যায়? এই কলোনির ইটের ঘরে কারও বাবার চাকরিজীবনের শুরু, কারও প্রথম সংসার, কারও প্রথম সন্তানের জন্ম। এই মিলের মাঠে খেলাধুলা করে একসঙ্গে বড় হয়েছে তাঁদের সন্তানেরা।

পিপলস জুট মিলের মো. লিটু মিয়া জুলাই মাসে কাজ হারিয়ে ধার–দেনা করে একটা অটো কিনেছেন। দেনার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। সকালে নাশতা হলে দুপুরে ভাত হয় না। ছেলেমেয়েদের কলেজে পড়িয়েছেন, এমএ (স্নাতকোত্তর) করিয়েছেন। অথচ উন্নয়নের দেশে চাকরি নেই তো! তাঁর স্ত্রী বলছিলেন, ‘প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট (সরকারি পাটকল) থেকে সবাইকে বের করে দিচ্ছে। ভয়ে আমাদের পরানটা কাঁপে। কখন না–জানি ঘর ভাঙতে হয়।’ সারাক্ষণ উচ্ছেদের ভয় নিয়ে কেমন করে বাঁচে একটা শ্রমিক পরিবার? একটা রাষ্ট্র শ্রমিকের বহুদিনের পাওনা পরিশোধ করেনি, অথচ জমি খালি করার নামে কত অবলীলায় বের করে দিচ্ছে! এ কেমন জুলুম? হাইকোর্টের রায় উপেক্ষা করে হাতিরঝিলে বিজিএমইএ ভবনটি কত বছর ধরে টিকে ছিল যেন? দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি কারা যেন দখল করে রেখেছে? সরকারের বুলডোজার তাদের বেলায় কই থাকে?

default-image

একটা মন্ত্রণালয়ের নাকের ডগায় দিনের পর দিন চুরিচামারি হয়েছে। সেই চুরির ভাগ–বাঁটোয়ারায় কে কে ছিলেন? শ্রমিক তো ছিলেন না। পরিচালনায়, পরিবহনে আর পাট কেনার প্রতিটি স্তরে নজিরবিহীন অনিয়ম কারা করে? শ্রমিক তো করেন না। সবাই জানে, সরকারি নেতা, সিবিএ নেতা, প্রকল্পপ্রধান, ব্যবস্থাপক ও সরবরাহকারীদের একাংশ—সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে ‘চুরি প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করে। সঠিক মৌসুমে পাট কেনার বরাদ্দ পাওয়া যায় না কেন? বেসরকারি মালিক কম দামে পাট কিনে গুদাম ভরে ফেলেন আর মৌসুম চলে গেলে বেশি দামে পচা পাট কেনে বিজেএমসি! শত শত বেল পাটের ভেতরে বালু দিয়ে ওজন বেশি দেখানো হয়। যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দুই গুণ, তিন গুণ বেশি দেখানো হয়। এসব তো পাটকলগুলোর বহু বছরের ‘ওপেন সিক্রেট’। সবাই জানে, বিজেএমসির একাংশ আগাগোড়া দুর্নীতিবাজ। চোরেরা ঠিকই চাকরি করে যাচ্ছেন, জনগণের করের টাকায় মোটা অঙ্কের বেতন ওঠাচ্ছেন। তাঁদের কিন্তু শাস্তি হয় না, চাকরিও যায় না। মাঝখান থেকে চাকরি চলে যায় ৫৭ হাজার শ্রমিকের! তা–ও আবার যখন বিশ্বজুড়ে পাটের চাহিদা তুঙ্গে?

এ কেমন রাষ্ট্র? পাওনা টাকার ব্যবস্থা না করেই এতগুলো মিল বন্ধ করে দেয়? চোর পাকড়াও না করে শ্রমিক ছাঁটাই করে? এ কেমন গণমাধ্যম, যেখানে এতগুলো শ্রমিকের বেআইনি উচ্ছেদের খবর এতটুকু গুরুত্ব পায় না? ক্রিসেন্ট জুট মিলের একজন বৃদ্ধ শ্রমিককে ধরা গলায় বলতে শুনেছিলাম, ‘আল্লাহ এই জুলুমের বিচার একদিন করবেন।’

একদিকে রাষ্ট্রীয় পাটকলের শ্রমিকের ঘরে চাল-ডাল-আটা ময়দা নেই। আরেক দিকে খালিশপুরের একসময়ের জমজমাট দোকানগুলো খাঁ খাঁ করে। জুট মিলের ধার ঘেঁষে ভাজি-পরোটার দোকান। একসময় ২৫ কেজি আটা–ময়দা কিনেও পরোটা বানিয়ে কুলানো যেত না। এখন সারা দিন ধরেও পাঁচ কেজি ময়দা শেষ হয় না। মিলগুলোর ধার ঘেঁষে কতশত দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবারই চার-পাঁচ মাসের দোকানভাড়া বাকি। দু-একটা অলংকারের দোকানও আছে। মেয়ের বিয়ের সময় সোনার চেইন, কানের দুল বানিয়ে দেন হয়তো শ্রমিক বাবা-মা। আহা, দোকানগুলো বন্ধ! মিলের শ্রমিকের জীবনের সঙ্গে জুড়ে ছিল কয়েকজন সোনার কারিগরের জীবনও। আলাদা করে কে রাখবে তাঁদের কাজ হারানোর খবর?

default-image

এক সবজি বিক্রেতা জানালেন, অন্য সময় বেলা ১১টার মধ্যে বেগুন, করলা, ধনে, পটোল বিক্রি হয়ে যেত। অথচ এখন বেলা পার হয়ে যায়, সবজি শুটিয়ে যায়, বিক্রি হয় না। শ্রমিকের চা পানের ছোট্ট স্টলগুলোও ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ভাতের হোটেল, আসবাবের দোকান, কাপড়ের দোকান, মুদির দোকান, দরজির দোকান, কলা-বনরুটির স্টল—সব শেষ। অথচ তাঁরা এতগুলো বছর কী এক গভীর আত্মীয়তার বন্ধনে একজন আরেকজনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। পাটকলশ্রমিকের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে এক পথে হেঁটেছেন। সবাই মিলে একটা শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে তুলেছিলেন।

এত এত সচল কর্মসংস্থান, সৎ পথে পয়সা কামানো কাজ, বহু বছর ধরে তিলে তিলে তৈরি হওয়া এই সব অতিপ্রয়োজনীয় স্থানীয় কর্মসংস্থান কলমের এক খোঁচায় ধ্বংস করে ফেলা যায়? তা–ও আবার এই করোনাকালে (কোভিড-১৯), যখন হাজারো কর্মসংস্থান ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে, হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখন পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত! নিজেদের শ্রমে–ঘামে গড়ে ওঠা স্থানীয় অর্থনীতির প্রতি এতটুকু দায়বোধ থাকলে এতগুলো মানুষের জীবন–জীবিকা এমন করে গুঁড়িয়ে ফেলা যায়? শতকোটি টাকার একটা কর্মচঞ্চল নগরী, ২০ তলা হাইটেক পার্ক বানিয়ে এই ক্ষতি পোষানো যাবে?

বিজ্ঞাপন
default-image

‘কর্মসংস্থানহীন’ উন্নয়ন

তবে এই ঘটনা নতুন কি? এ–ই তো হচ্ছে। ৮ শতাংশ জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) দেশে প্রবৃদ্ধি আছে, কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। অথচ সচল কর্মসংস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র হবে, জমি দাও। টার্মিনাল হবে, জমি দাও। অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে, জমি দাও। ফাইভ স্টার হোটেল হবে, জমি দাও। আর জমির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আজীবনের কর্মসংস্থান? কৃষকের জীবিকা? ক্ষতিপূরণ দিয়ে নাকি পুষিয়ে দেওয়া হয়? তা এই দেশে মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া, মাসের পর মাস ধরনা দেওয়া ছাড়া ক্ষতিপূরণ মেলে? জমি, গরু, গোয়ালঘর হারিয়ে তাই ‘মেগা’ প্রকল্পে মিস্ত্রির কাজ পান কৃষক। আজীবনের জীবিকার বদলে সাময়িক ভাড়ায় খাটা কাজ করে। চাকরি আজ আছে তো কাল নেই।

হাজারো কৃষক উচ্ছেদ করে ঠিক কয়টা চাকরি তৈরি হয়েছে এসব এলাকায়? পায়রা কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে কিন্তু কাজ করছেন তিন হাজার চীনা শ্রমিক। রামপালে কাজ করছেন কয়েক শ ভারতীয়। জমি হারিয়েছে কৃষক পরিবার। একসময় ধানি জমি ছিল, জেলেনৌকা ছিল, জালের ব্যবসা ছিল। এখন সব শেষ। প্রকল্পে চলে গেছে ৭ হাজার একর উর্বর জমি। ভরা আউশের মাঠের গেরস্ত কৃষক জমি হারিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের দারোয়ান হয়ে গেছে।

এত এত কৃষক আর জেলেকে জমি থেকে তুলে দিয়ে কোন নতুন কর্মসংস্থানটা তৈরি হয়েছে এই দেশে? গ্রামীণ মানুষের সারা জীবনের নিশ্চিন্ত কর্মসংস্থান নষ্ট করে শহরের রাস্তায় রিকশাচালক আর হকারের সংখ্যা শত গুণ বাড়াল কারা? আবার সেই একই রাস্তায় শত শত অটোরিকশা গুঁড়িয়ে আর হকার হটিয়ে কটা নতুন চাকরি তৈরি করেছে সরকার?

default-image

এ দেশের ৮৭ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতের। অর্থাৎ কারও দয়া–দাক্ষিণ্যে নয়, বরং নিজেদের হাড়ভাঙা পুঁজি খাটিয়ে, মাথা খাটিয়ে, থানা-পুলিশ ম্যানেজ করে, অমানুষিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উপার্জন করে এই দেশের মানুষ। ‘ব্যবসার পরিবেশে’ বাংলাদেশের অবস্থান তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে (দেখুন বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স, ২০২০)। আর যে চাকরিগুলো তৈরি হয় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড), গার্মেন্টসে; সেগুলো কেমন? মানুষ বাঁচে তো? গবেষণা তো বলে, সর্বোচ্চ ডলার উপার্জনকারী ইপিজেডের শ্রমিক সারা বছর ধার–দেনা করে বাঁচেন, কম খেয়ে বাঁচেন, অপুষ্টি আর রক্তশূন্যতায় বাঁচেন (দেখুন মেড ইন পভার্টি, অক্সফাম, ২০১৯)।

অন্যদিকে পাটকল, চিনিকল, কাগজকল, কৃষক, জেলে—যা কিছু আমাদের চালু কর্মসংস্থান, স্থানীয় কর্মসংস্থান, একটা একটা করে সব ধ্বংস করে দিয়ে একটা গোটা দশক ধরে কর্মসংস্থানহীন ‘উন্নয়ন’ করে গেছে সরকার। যে উন্নয়নে চাকরি নেই, কাজ নেই, মিল নেই, বসতভিটার নিরাপত্তা নেই। অবশ্য উন্নয়নসংক্রান্ত কিছু ভালো খবরও আছে। যেমন বাংলাদেশে ধনীদের সম্পদ অতি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। আর অতিধনী বৃদ্ধির হারে চীন আর ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে আপাতত বিশ্বে সবার শীর্ষে বাংলাদেশ (ওয়েলথ-এক্স রিপোর্ট, ২০১৯)।


লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক

মন্তব্য করুন