default-image

ভ্যানযাত্রীদের একজনের হাতে হারিকেন, পানির জগ, বাজারের থলে। আরেকজনের হাতে থালাবাসন বাঁধা পুঁটলি। বস্তার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ঘরের ব্যবহৃত তৈজসপত্র। মায়ের কোলে ছোট্ট শিশু।
এটি নিরেন মুরমুর এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য। এলাকা ছাড়ার কারণ পানির সংকট। পানির অভাবে চাষাবাদ নেই। জমি অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে। ফলে সংসার চলছে না শ্রমজীবী নিরেনের। এমন অন্তত ১০০টি পরিবার এলাকা ছেড়েছে বলে জানান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান।
নিরেন মুরমুর বাড়ি রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির শিবপুর গ্রামে। এটি বরেন্দ্র অঞ্চল। এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। কোনো বছর ভারী বর্ষণ হলে আমন হয়। তা ছাড়া অন্য কোনো ফসল হয় না। তাই শ্রমজীবী মানুষেরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। জমির মালিকেরা পড়েছেন ভীষণ সংকটে। তাঁরা না পারছেন ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে, না পারছেন চাষবাস করতে।
নিরেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে আবাদ হলেও এলাকায় কাজ পেতেন। কিন্তু পানির অভাবে চাষাবাদ নেই। তাই পরিবার নিয়ে তাঁরা পাশের মোহনপুর উপজেলায় চলে যাচ্ছেন।
গতকাল জানতে চাইলে নিরেন বলেন, মোহনপুরের আম্রইল গ্রামে ধান কাটার কাজ করছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই গ্রামের একটি গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সরকারের কোনো প্রকল্পের আওতায় কোনো কাজ পাননি।
২৬ এপ্রিল উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের বৈদ্যনাথপুর, জোকারপাড়া, ঝিনাইখোর, হরিশপুর, নারায়ণপুর ও শিবপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিঘার পর বিঘা জমি অনাবাদি। একটু সবুজ ঘাসও নেই। ধূসর মাটি।
৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ২১ হাজারের মতো। ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ জমি বরেন্দ্র সেচ প্রকল্পের আওতায় আছে। বাকি জমির চাষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ জমি সেচ প্রকল্পের বাইরে হওয়ায় এখানে পানির সংকট তুলনামূলক বেশি।
হরিশপুর গ্রামের চাষি শরিফুল ইসলাম (৫০) প্রথম আলোকে জানান, দুই বছর আগে তিনি তিন বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছিলেন। খরায় সব ধান পুড়ে গিয়েছিল। এক মণ ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এরপর থেকে আর ওই জমিতে চাষাবাদ করেননি।

default-image

নারায়ণপুর উঁচুডাঙ্গা গ্রামের চাষি মো. সেলিম বলেন, তিনি গত বছর দুই বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছিলেন। মাত্র দুই মণ ধান ঘরে তুলতে পেরেছিলেন। এবার আর ধান রোপণের কোনো পরিবেশই নেই। তিনি বলেন, গ্রামে একটি গভীর নলকূপ আছে। শুরুতে ২০০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যেত। এখন মাত্র ৫০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যায়। তা-ও তিন গুণ সময় লাগে। সময়মতো পানি পাওয়া যায় না। ঠিকমতো আবাদও হয় না।
রামদেপুর আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৮০টি পরিবারের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প করা হয়েছিল। সেখানে কমিউনিটি সেন্টারও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পানির অভাবে এলাকায় আবাদ না হওয়ায় প্রায় অর্ধেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
গতকাল শুক্রবার মুঠোফোনে জানতে চাইলে বাধাইড় ইউপির চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান বলেন, গভীর নলকূপেও সব জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ভারী বর্ষণও হচ্ছে না। এ কারণে ইউনিয়নের অন্তত দেড় হাজার বিঘা জমি পতিত রয়েছে। কাজ না পেয়ে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ এলাকার আরও কয়েকটি গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে বলে জানান তিনি। সরকারি যেসব প্রকল্পের কাজ আসে, তা ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে ভাগ করে দিতে হয়। সেই তুলনায় অভাবী মানুষের সংখ্যা বেশি। এ কারণে সবাই সুবিধা ভোগ করতে পারেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাধাইড় এলাকাটি এমনিতেই বেশ উঁচু। পানিসংকটের কারণে এখানে তিন বছর ধরে বোরোসহ প্রায় কোনো ফসলের আবাদ হয় না। তবে ঠিক কতটুকু জমি এখন অনাবাদি, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ এলাকায় বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে আমনের চাষ হয়। তাও খুব একটা ভালো হয় না।
গতকাল রাতে মুঠোফোনে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘ওই এলাকায় কিছু জমি পতিত থাকে। সময় সময় কাজের জন্য কিছু মানুষ অন্য এলাকায় যায়। কিন্তু মাইগ্রেট করে এলাকা ছেড়ে লোকজন চলে যাচ্ছে, এমন তথ্য আমার কাছে নেই।’
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ওই ইউনিয়নের যেসব এলাকা পতিত আছে, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাওয়া যায় না। এ কারণে গভীর নলকূপ বসানো যায় না। তবে স্তর পাওয়া গেছে, এমন এলাকায় ৭০টি নলকূপ রয়েছে। বোরো মৌসুমে এসব নলকূপে ৫০ শতাংশেরও কম পানি ওঠে। তাই বেশি জমিতে সেচ দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন