যদিও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লকডাউনের শুরু থেকে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের দুর্বল আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে অনেক দিন পর্যন্ত অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি। করোনা মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে ৭ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। যেহেতু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীরা সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে এসে থাকে, তাই শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারার বিষয়টি সামনে চলে আসে।

বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের বৈঠকে অনলাইন ক্লাসে বেশি শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির জন্য তাদের ইন্টারনেট কিনে দেওয়া, ক্লাসের অডিও-ভিডিও মেটারিয়াল আপলোড করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। তবে ইন্টারনেট কিনে দেওয়ার জন্য বরাদ্দ না থাকা, যে শিক্ষার্থীদের সহায়তা লাগবে সে বিষয়ে তথ্য না থাকা এবং ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের শঙ্কায় কিছু শিক্ষকের ভিডিও আপলোডে আপত্তিসহ নানা চ্যালেঞ্জে সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণে যাতে কোনো বৈষম্য না থাকে, সে জন্য স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা অন্যান্য বিভাগের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। উল্লেখ্য, যে কৌশলগুলো অবলম্বন করা হয়েছে সেগুলো নতুন কিছু নয়। কিন্তু কৌশল বাস্তবায়নের পদ্ধতিগুলো কিছুটা অনন্য, যা চাইলে অন্য বিভাগগুলো সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারবে।

প্রথমত, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কি ধরনের সমস্যা হচ্ছে, সে সম্পর্কে বাস্তবিক জ্ঞান দরকার। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট গুগল ফর্মের মাধ্যমে একটি অনলাইন জরিপের ব্যবস্থা করে। অনলাইন জরিপের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো যে কারণে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে না, সেই একই কারণে তারা অনলাইন জরিপেও অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে যেসব শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে না, তাদের সমস্যা অনলাইন জরিপে উপস্থাপিত হবে না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট অন্য শিক্ষার্থীদের সহায়তা নিয়ে সেসব অনগ্রসর ছাত্রছাত্রীদের খুঁজে বের করে এবং তাদের অন্যদের সহযোগিতা নিয়ে অনলাইন ফরম পূরণ করার জন্য অনুরোধ করা হয়। তারপরও যারা পূরণ করতে পারেনি, তাদের মতামত মোবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে অনলাইন জরিপে অন্তর্ভুক্ত করে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের চালানো অনলাইন জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে যাদের ইন্টারনেট কেনা এবং ডিভাইস কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন, সেই ছাত্রছাত্রীদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এরপর সেই তালিকার প্রতিটি শিক্ষার্থীর সঙ্গে সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত করা হয় যে তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতজনের আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

default-image

অনলাইন জরিপ ও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে ২৫ (প্রায় ৮ শতাংশ) জন শিক্ষার্থীকে বাছাই করা হয়। তাদের ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে মাসিক ৫-৬ গিগাবাইট ডেটা কেনার ব্যবস্থা করা হয় এবং এর জন্য প্রতি মাসে মোট ৯ হাজার টাকার মতো টাকা খরচ হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ৩ জন এমন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়, যাদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে শুধু ইন্টারনেট না, স্মার্ট ফোন/ডিভাইস না থাকাও একটি প্রতিবন্ধকতা। তাদের প্রত্যেককে স্মার্ট ডিভাইস কেনার জন্য বিকাশের মাধ্যমে এককালীন একটি অনুদান (১০,২০০ টাকা) প্রদান করা হয়। তবে এ প্রক্রিয়া চলমান এবং প্রয়োজনে আরও শিক্ষার্থীদের এর আওতায় আনা হবে।

উল্লেখ্য, পূর্বেই ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে অর্জিত আয়ের কিছু অংশ ও শিক্ষকদের স্বেচ্ছা প্রদত্ত অনুদানের ভিত্তিতে একটি স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড (শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল) গঠন করা হয়েছিল এবং এই তহবিল থেকেই শিক্ষার্থীদের মাঝে ইন্টারনেট ও স্মার্ট ডিভাইস কেনার জন্য অর্থসহায়তা প্রদান করা হয়।

এ ছাড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনলাইন জরিপে উঠে আসে। ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য থাকলেও কম গতির সংযোগ বা সংযোগ স্থিতিশীল না থাকার কারণে (শহরাঞ্চলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য) অনেক শিক্ষার্থীর অনলাইনে ক্লাস করতে সমস্যা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ক্লাসের পরে আডিও/ভিডিও আপলোড একটি সমাধান হতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনেকের মধ্যে ক্লাসের ভিডিও আপলোড করার অনিহা একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা, যা ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সহায়ক হতে পারে।

অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা যাতে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব। অনেকে যুক্তি দেখান যেহেতু সাধারণ সময়ে (করোনা–পূর্বকালীন সময়ে) ক্লাসে শতভাগ উপস্থিত থাকে না, সুতরাং এখনো সবাই উপস্থিত না থাকাটা কোনো সমস্যা নয়। তবে আর্থিক কারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে না পারা আর স্বেচ্ছায় অনুপস্থিত থাকাকে এক কাতারে ফেলা শুধু অযৌক্তিকই নয়, অন্যায়ও বটে। তাই তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সরকার মোবাইল কোম্পানির সঙ্গে স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট নিশ্চিতে আলোচনা করা যেতে যেতে পারে। তা ছাড়া নেটওয়ার্ক সমস্যা সমাধানেও চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

ইচ্ছা থাকলে অল্প সম্পদ দিয়ে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা যায় ও সমাজে প্রভাব ফেলা যায়। মহামারির শুরু থেকেই স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট মহামারি সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছে। উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্য বিমা চালু করে ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং যা পরবর্তী সময়ে অনেক বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়।

*লেখক: নাফিস ইফতেখার তুলন, সহকারী অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাবি, শাফিউন শিমুল, সহকারী অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইস্টিটিউট, ঢাবি এবং
এহসানুল কবির, গবেষণা সহযোগী, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাবি

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন