default-image

সে সময় সবাই করোনার কারণে বাসায় বন্দী। বন্দী মানে একদমই বন্দী। সামাজিক দূরত্ব মানার আওয়াজ উঠেছে চারদিকে আর সামাজিককাজ করে আসা ছেলেগুলোও ঘরে বন্দী। কেমন জানি বেমানান লাগতে থাকে নিজেকে।

শুরু হয় ‘অকশন ফর অ্যাকশন’।

ধারণা খুব সাধারণ। যদি ভারতের দিকেও তাকাই, দেখা যাবে এই মহামারির সময় হয়তো শাহরুখ খান দরিদ্রদের জন্য মুহূর্তেই ১০–১৫ লাখ টাকার চেক লিখে দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক তারকাকে এই মহামারির সময় সমাজের জন্য কিছু করার সাধ থাকার পরও সাধ্য না থাকায় চুপ করে ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

হ্যাঁ, আমাদের দেশের গুটিকয়েক তারকা ছাড়া বাকি সবাই মধ্যবিত্ত পরিবারের…। সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছা কিন্তু আবার তাঁদের একবিন্দুও কম নেই। তাঁদের ঘরে ফেলে রাখা জিনিস ব্যবহার করে যদি গরিবদের জন্য টাকা সংগ্রহ করা যায় ঘরে বসেই, তাহলে মন্দ কী।

আলোকচিত্রী প্রীত রেজা আর আমার ঘরে বসে শুরু হয় সামাজিক কাজ করার এক উদ্যোগ। ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সংগীতশিল্পী, কবি, নাট্যকার, অভিনেতা, সিনেমার নায়ক—যাঁকেই এই উদ্যোগের কথা বলা হয়, তিনিই একবাক্যে রাজি হয়ে যান।

এভাবে শুরু হয় অকশন ফর অ্যাকশনের প্রথম পর্ব। ভাগ্যগুণে প্রথম পর্বই শুরু হয় সাকিব আল হাসানের এক স্মৃতিময় ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে। সাকিবের ব্যাটের অছিলায় আমরা আমাদের ব্যারিস্টার চিশতীকে পাই এই উদ্যোগের সঙ্গে। তিনি যুক্তরাজ্যে বসেই আমাদের এই অনলাইন উদ্যোগের সব গুছিয়ে দেন। এমনকি তিনি সাকিবকে বলে তাঁর ওয়ান ডে ম্যাচে প্রায় ১৫ হাজার রান তুলে আনা ব্যাট জোগাড় করে দেন। এই ব্যাট দিয়েই পুরো বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো খেলেছেন সাকিব।

আলোকচিত্রী প্রীত রেজা আর আমার ঘরে বসে শুরু হয় সামাজিক কাজ করার এক উদ্যোগ। ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সংগীতশিল্পী, কবি, নাট্যকার, অভিনেতা, সিনেমার নায়ক—যাঁকেই এই উদ্যোগের কথা বলা হয়, তিনিই একবাক্যে রাজি হয়ে যান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাকিবকে প্রশ্ন করা হয়, এত প্রিয় ব্যাট কেন দিয়ে দিচ্ছেন?

সাকিব বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা আমার খুবই প্রিয় একটা ব্যাট। তবে দেশের মানুষ নিঃসন্দেহে আমার কাছে এর থেকেও বেশি প্রিয়।’

মুহূর্তে ফেসবুক লাইভে এসে ব্যাটের দাম উঠে যায় ১০ লাখ টাকার ওপর। ১ ঘণ্টার এই পর্বের মধ্যেই ব্যাটটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। পরের দিনই ক্রেতা টাকা পাঠিয়ে দেন।

default-image

এই ২০ লাখ টাকা দিয়ে পরবর্তী সময়ে কী করা হয়েছিল, সব বিস্তারিত অকশন ফর অ্যাকশন পেজ পরের দিনই জানিয়ে দেয়।

স্বচ্ছতার সঙ্গেই এগোতে থাকে আমাদের এই উদ্যোগ।

পরের পর্বের জন্য একজন সংগীতশিল্পীর স্মৃতিঘেরা কিছু জিনিসের ছবি তোলা হয়। বলছিলাম তাহসান খানের কথা। তাঁর জনপ্রিয় ‘কথোপকথন’ অ্যালবামটির অরিজিনাল মাস্টার ডিএটি এবং সঙ্গে ২০০৪–এর দিকে ‘ঈর্ষা’ গানটির তাহসানের হাতে লেখা লিরিকসের পৃষ্ঠা তোলা হয় নিলামে। ক্রেতা এ দুটি স্মারকের সঙ্গে তাহসানের বাসায় বসে কি–বোর্ডে লাইভ গান শোনার সুযোগও পাবেন। এই সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায় ১০ লাখ টাকায়।

ক্রেতা তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে চমক দেওয়ার জন্যই এটা কিনেছেন। পরের দিনই টাকা চলে আসে। সেই টাকা তাহসান তুলে দেন ব্র্যাকের হাতে।

দ্বিতীয় পর্ব শেষ হতে না হতেই অসংখ্য স্মারক আসতে লাগল তারকাদের কাছ থেকে। কেউ আবার দিতে চান অভিজ্ঞতাও। যেমন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তিশা দম্পতি তাঁদের পরবর্তী চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিতে চান। অনন্ত জলিল নিয়ে আসেন তাঁর সঙ্গে লং ড্রাইভে যাওয়ার, মাইলস ব্যান্ড নিয়ে আসে তাঁদের সঙ্গে জ্যামিং করার, মোশাররফ করিম তাঁর বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানোর প্রস্তাব দেন।

তবে আমরা ১২টির বেশি পর্ব করতে পারিনি। ১২ পর্বের পরেই একটা সিজন ব্রেকে যায়। আমরাও তা–ই করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল গত ১২ পর্ব থেকে পাওয়া অর্থ ভালোভাবে ব্যবহারের জন্য সময় নেওয়া। এক হাতে টাকা তুলে আরেক হাত দিয়ে দান করে দেওয়া মোটেই উদ্দেশ্য ছিল না এই উদ্যোগের। টেকসই সমাধান বের করা ছিল উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রথম সিজন থেকে আয়

দুই মাসের প্রথম সিজনে কোটি টাকার বেশি উঠে আসে। উল্লেখযোগ্য নিলামগুলো হলো প্রয়াত ফুটবলার মোমেন মুন্নার জার্সি (৫ লাখ টাকা), চিরকুট ব্যান্ডের সুমির নাকের নোলক (১০ লাখ টাকা), অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির ব্যবহৃত শেষ চশমা (৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা), বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত ওয়ান ডে ক্রিকেটে করা শেষ হ্যাটট্রিকের বল যেটি তাসকিন আহমেদ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ব্যবহার করেন (৪ লাখ টাকা), সৌম্য সরকারের নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৪ বলে করা প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির ব্যাট (যা বিক্রি হয় ৪ দশমিক ৫ লাখ টাকায়), ফিফা রেফারি তৈয়ব হাসানের দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রেফারি হিসেবে সাফের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করার জার্সি (৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা) এবং সবকিছু ছাপিয়ে যায় মাশরাফি বিন মুর্তজার হাতের ব্রেসলেটটি (৪২ লাখ টাকা)।

প্রতিটি পর্বের ফাঁকেও ছোট ছোট নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি নির্মলেন্দু গুণের হাতে লেখা ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’ কবিতাটি ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকায় নিলামে বিক্রি হয়েছে বা ১৫ জনের বেশি ক্রিকেটারের সই করা ক্রিকেট ব্যাট বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ টাকায়।

তখনো এই অকশন ফর অ্যাকশন পেজের অনেক কিছুই নিলামে তোলা বাকি। যেমন জেমসের গিটার, হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে লেখা কিছু স্মারক, বাকের ভাইয়ের (আসাদুজ্জামান নূর) সঙ্গে চায়ের দোকানে ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’ গান শুনতে শুনতে আড্ডা বা লিটন দাসের ১১৭ বলে ১২১ করা ব্যাটটি, এনামুল হক বিজয়ের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করা ব্যাট ইত্যাদি।

এই আয়োজন সফল করতে পেরে আমাদের মনে হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু সদিচ্ছা, ভালো পরিকল্পনা থাকলে এবং আস্থা আনতে পারলে যে কেউ যেকোনো উদ্যোগে সফল হতে পারবে।

আরিফ আর হোসেন: ‘আমরাই বাংলাদেশ’–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা

মন্তব্য পড়ুন 0