default-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় পানির তীব্র সংকটের মুখে স্থানীয় মানুষ। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে বন উজাড় হয়ে গেছে। এর ফলে পানির উৎস যেমন ঝিরি, খাল শুকিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের উন্নয়ন নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।  আর পাহাড়িদের প্রথাগত জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে।

‘পানিসংকটে জুম পাহাড়ের মানুষ’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। আজ সোমবার এ সংলাপের আয়োজন করে নৃগোষ্ঠীর মিডিয়া সংস্থা আইপিনিউজ।

সংলাপে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পানি যেখানে থাকবে না, সেখানে জীবন থাকবে না। কাজেই পানিসংকট যেহেতু চলে আসছে, সেখানে আরও নানা ধরনের সংকট তৈরি হবে।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, বিধি বা আইন অনুযায়ী পাহাড়ে কোনো ইটভাটা থাকার কথা নয়। কাজেই যত ইটভাটা আছে, সেগুলোর বৈধ কোনো ছাড়পত্র থাকার কথা নয়। সেই ইটভাটাগুলোর তালিকা তৈরি করে আইনি লড়াই চালানো জরুরি বলেও মনে করেন তিনি। তা ছাড়া যে জায়গায় পানির তীব্র সংকট আছে, যে ঝিরি ও ঝরনাগুলোর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর তালিকা তৈরি করে সেগুলোর সার্ভে, অবস্থান এবং শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব নিরূপণ করা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।

আলোচনায় পাহাড়ের বেসরকারি সংগঠন জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছরই পাহাড়ের মানুষগুলোকে এই সংকটে পড়তে হয়। এর মূল কারণ হলো, পাহাড়ে আগে বড় বড় গাছ ছিল। পাহাড় না কেটে আমরা ঘর-বাড়ি তৈরি করতাম। ছড়াগুলো ছন্দময় ছিল। ছড়ার পাথর তোলা, গাছ বিক্রি করা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এখন বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গল আগের মতো সবুজ নেই। চারদিকে ন্যাড়া পাহাড়। যার কারণে পাহাড়ে এখন পানির সংকট।

বিজ্ঞাপন

আমরা তথাকথিত সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলাতে ইটভাটা গড়ে তুলছি, দাবি করে তিনি আরও বলেন, ইটভাটাগুলোতে কচি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে, যা পরিবেশের ক্ষতি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অনুরাগ চাকমা বলেন, ‘এই সংকটের মূলে কয়েকটি ন্যারেটিভ কাজ করছে। এসবের একটি হচ্ছে ন্যাচারাল কষ্ট। সেটা হচ্ছে অনাবৃষ্টি। অন্য আরেকটি দিক হলো পাহাড়ের মানুষ যখন ব্যবসা চিনতে শুরু করে এবং পুঁজিবাদী ধারার বিকাশ ঘটতে শুরু করে, তখন আমরা বিবেক, মানবতা সবকিছু বিক্রি করতে শুরু করেছি।’ অতিমাত্রায় লোভ আমাদেরকে ‘ইকোসাইড’ (পরিবেশ হত্যা) এ উদ্বুদ্ধ করছে বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বন ও জঙ্গল উজাড়ের পেছনে আরেকটি মহল দায়ী। সেটা হলো বন বিভাগ। রাষ্ট্রের বন রক্ষার দায়িত্ব যাঁদের হাতে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটা যোগাযোগ রয়েছে । যার মাধ্যমে পাহাড় তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বন দখল করা হচ্ছে এবং পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ফলেই বন বিভাগসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এই ধরনের কার্যক্রমে জড়িত হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমা বলেন, পাহাড়ের পানি কাঠামো টিকে আছে প্রাকৃতিক ঝরনা, প্রাকৃতিক বন, ঝিরি, ছড়ার ওপর। এই প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ করেন কেবল জুমচাষিরা। আগেকার দিনে জুমচাষিরা কয়েক বছর অন্তর এক জায়গায় জুমচাষ করেন। এর ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সেখানে প্রাকৃতিক বন গজিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখন সেই প্রাকৃতিক বন উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে পানি কাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সুস্মিতা চাকমা বলেন, পাহাড়ে পানি তোলার কাজটি প্রথমত নারীরাই করে থাকেন। নারীরা উঁচু পাহাড় বেয়ে দৈনন্দিন পানি সংগ্রহের কাজটি করেন। একজন নারীকে যখন বেশি সময় ব্যয় করে দূর প্রান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, তখন তাঁর নিরাপত্তার দিকটি যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি অন্য কাজের সুযোগও কমে যাচ্ছে। অনেকেই ধর্ষণ তথা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, লাগাতার অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে এই সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যায়ভাবে এসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করে, স্থানীয় পাহাড়িদের সামাজিক বিশ্বাসকে তুচ্ছ করে এবং পরিবেশবিজ্ঞানের সূত্রকে অমান্য করে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনার ফলেই এই সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন হিউমেনিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মং মং সিং মারমা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জাহেদ হাসান প্রমুখ। আইপিনিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আন্তোনি রেমা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন