সংবাদ সম্মেলনে রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটির সদস্য রণজিৎ পাহাড়িয়া লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরেজমিনে মাত্র এক দিন ঘুরে তাড়াহুড়া করে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তদন্ত করেছে। তাঁরা জানতে পেরেছেন, এ তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত বিষয় উঠে আসেনি। তদন্ত কমিটিকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কৃষকেরা যেভাবে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা–ও হুবহু আসেনি। তাই পুনরায় গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়, শুধু বোরো ধানের খেতে পানি না দেওয়ার কারণে অভিনাথ ও তাঁর চাচাতো ভাই রবি গভীর নলকূপের সামনেই বিষ পান করেন। কিন্তু একটি পক্ষ তাঁদের মৃত্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। বলা হচ্ছে, চোলাই মদ পানে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। রণজিৎ পাহাড়িয়া বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের চোলাই মদ পান করেন। এটা তাঁদের সংস্কৃতি। এ জন্য তাঁদের মৃত্যু হয় না। এখন এ বিষয়কেই সামনে এনে ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিএমডিএ) বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে।

default-image

লিখিত বক্তব্যে রণজিৎ পাহাড়িয়া আরও বলেন, দুই কৃষকের আত্মহননের পেছনে বিএমডিএর গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াত হোসেনের মতো জাতিবিদ্বেষী মানুষ যেমন দায়ী, ঠিক তেমনি এ বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থা বিএমডিএর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম সমানভাবে দায়ী। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে সাখাওয়াত ১২৫ টাকা ঘণ্টার পানি ১৩৫ টাকায় কৃষকদের কাছে বিক্রি করতেন। এ অনিয়ম বহুদিন ধরে চলতে থাকলেও কর্তৃপক্ষের কোনো তদারকি ছিল না।

সংবাদ সম্মেলনে গভীর নলকূপের অপারেটরদের কিছু অনিয়ম তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গভীর নলকূপের ট্রান্সমিটার পাহারা দেওয়ার জন্য প্রতি মৌসুমে কৃষকদের কাছে থেকে জনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা উত্তোলন করা হতো, যে খরচের কোনো হিসাব নেই। চেম্বার মেরামতের জন্য কৃষকপ্রতি ৫০ টাকা করে তোলা হতো। সেচের পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সিরিয়াল অনুসরণ করা হতো না। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের ক্ষেত্রে সিরিয়াল থাকলেও ৮-১০ দিন ঘোরানো হতো। পানি দেওয়া হয় গভীর রাতে। নলকূপ অপারেটর স্কিমভুক্ত জমিতে নিজের পাওয়ার টিলার ছাড়া অন্য কোনো পাওয়ার টিলার ব্যবহার করতে দেন না এবং বেশি চার্জ আদায় করেন।
অভিযোগ করা হয়, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের ক্ষেত্রে পানি না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে বাড়ির কাজ করিয়ে নিতেন সাখাওয়াত। সেচের পানির জন্য পীড়াপীড়ি করলে কৃষকদের বলতেন ‘তোদের পানি দেয়া হবে না, পারলে কেস কর গা।’

নলকূপের কিছু নষ্ট হলে ৫০০ টাকার খরচের জন্য কৃষকদের কাছে থেকে ৫ হাজার টাকা আদায় করতেন তিনি। চাষিদের সেচ কার্ড থাকলেও অপারেটর তাঁর নিজের কার্ড ব্যবহারে বাধ্য করতেন। অপারেটর তাঁর নিজস্ব আবাদি জমিতে জোর করে কম মজুরিতে কাজ করাতে বাধ্য করতেন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বর্গা চাষের জন্য ১০ বিঘা জমি থাকলে পানি না দেওয়ার হুমকি দিয়ে দুই বিঘা জমি জোর করে বর্গা চাষের জন্য কেড়ে নিতেন সাখাওয়াত। দীর্ঘদিন ধরেই এসব চলে আসত। বিএমডিএ সেচব্যবস্থার নামে যে শোষণযন্ত্র তৈরি করেছে, তার দায় তাঁরা এড়াতে পারে না।

সংবাদ সম্মেলন থেকে কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো কৃষক অভিনাথ ও রবির আত্মহত্যায় প্ররোচণা দেওয়ায় সাখাওয়াত হোসেনকে বিচারের মাধ্যমের শাস্তি নিশ্চিত করা, সেচ কার্যক্রমের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের জন্য বিএমডিএ কর্তৃপক্ষকে তদন্তের আওতায় এনে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ, নলকূপ পরিচালনার ক্ষেত্রে কৃষকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নলকূপ অপারেটর হিসেবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া।

সংবাদ সম্মেলনে সিসিবিভিওর সমন্বয়কারী মো. আরিফ, রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটির সভাপতি সরল এক্কা, সাবেক সভাপতি প্রসেন এক্কাসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন। গত ২৩ মার্চ গোদাগাড়ীর নিমঘটু গ্রামের কৃষক অভিনাথ ও তাঁর চাচাতো রবি বিষ পান করলে তাঁদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পরিবারের করা আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলার আসামি সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এখন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন