default-image

মানব পাচারবিরোধী আইনের সংশোধন করে পুলিশের ক্ষমতা কমানোর দাবি করেছে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। সংগঠনটি বলছে, এ আইনে পুলিশকে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার অপব্যবহার হচ্ছে। পুলিশ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের অযথা হয়রানি করছে।

বায়রার এই দাবিকে সমর্থন করছে দুই মন্ত্রণালয়—পররাষ্ট্র এবং প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান। তারাও আইন সংশোধনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। অন্যদিকে বায়রা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আইন সংশোধনের এসব দাবি এমন সময় উঠছে, যখন পুলিশ ও র‍্যাব দেশজুড়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। বেশ কয়েকজন বড় মানব পাচারকারী ধরা পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিদেশগামীরা যাতে প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য প্রতারক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে গত মে মাসে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন অভিবাসী হত্যার ঘটনার পর মানব পাচার রোধে আরও কঠোরতার দাবি উঠেছে।

অবশ্য বায়রার যুক্তি হলো, বৈধভাবে যারা জনশক্তি রপ্তানি করে তাদের ক্ষেত্রে কোনোভাবে মানব পাচার আইন প্রযোজ্য নয়। এ ছাড়া তারা পরোয়ানা ছাড়া কার্যালয়ে অভিযান ও সরঞ্জাম জব্দ করার ক্ষমতা নিয়েও আপত্তি করছে।

সংগঠনটির মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সব প্রক্রিয়া মেনেই কর্মী পাঠান। কিন্তু কেউ বিদেশ থেকে ফিরে অভিযোগ করলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন অনুসরণ না করে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের অধীনে মামলা করে। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের আটক করে। এরপর তাঁদের ছয়-সাত মাস জেল খেটে বের হতে হয়।

মানব পাচারবিরোধী অভিযানের মধ্যে আইন সংশোধনের দাবি করছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা। পক্ষে দুই মন্ত্রণালয়।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনটি হয় ২০১২ সালে। এতে অনুমোদন সাপেক্ষে (নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার) পুলিশের উপপরিদর্শক পর্যন্ত পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তল্লাশি করা ও সরঞ্জাম জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বিনা পরোয়ানায়ও তল্লাশি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, অপরাধটি প্রকৃতই সংঘটিত হওয়ার বা কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে।

আইনটি হওয়ার আগে ও পরে বায়রা আপত্তি জানিয়ে আসছে। তবে নতুন করে তাদের তৎপরতা শুরু হয় সেপ্টেম্বর। ওই মাসের মাঝামাঝিতে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে। একই সময়ে বায়রার পক্ষ থেকে আইন পরিবর্তনের যুক্তি তুলে ধরে একটি চিঠিও দেওয়া হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে চিঠি দেন গত ২১ সেপ্টেম্বর। চিঠিটির অনুলিপি দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীকে। এতে বলা হয়, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের একটি ধারায় বৈপরীত্য থাকায় জনশক্তি রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে। এ আইনে দুটি ধারায় পুলিশ বাহিনীকে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যার কারণে আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বায়রা যে ধারা বদলের কথা বলছে, তা দেশের অনেক আইনেই রয়েছে। তাদের দাবি আসলে মামাবাড়ির আবদার। এটি অন্যায়ও বটে।
সি আর আবরার, চেয়ারপারসন, রামরু

চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নয় এবং তারা হয়রানির শিকার হচ্ছে। বায়রার সদস্যরা আইনটির কয়েকটি ধারা বাতিলের জন্য দেনদরবার করছেন। একই বিষয়ে ২০১৯ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একটি চিঠির কথাও উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আইনটি আংশিক সংশোধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, বায়রার নেতারা তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। মন্ত্রীদের চিঠিও তিনি পেয়েছেন। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সুপারিশের পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে মানব পাচার আইনে কোনো কোনো ধারা অজামিনযোগ্য বলে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তা বলেন, এ আইনের অধীনে করা মামলায় আটক হলে জামিন পাওয়া কঠিন। এ কারণেই তারা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আইনের পরিবর্তন চাইছে। কিন্তু তারা যে ধরনের অপরাধ করে, তা মানব পাচারের মধ্যেই পড়ে।

যেমন গত ২৪ সেপ্টেম্বর র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েন শেখ আমিনুর রহমান ওরফে হিমু (৫৫) নামের একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক। তাঁরা ব্রুনেইয়ে পর্যটক ভিসায় শ্রমিক পাঠাতেন বলে অভিযোগ। প্রতারিত এক শ্রমিক পিরোজপুরের নাজিরপুরের যুবক মনির হোসেন (৩৫) ব্রুনেইয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মারধরে চলার শক্তি হারিয়েছেন।

মানব পাচার আইন পরিবর্তনের বিরোধী জনশক্তি রপ্তানি খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক সি আর আবরারও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধের আইনটি বেশ ভালো। এটি অংশীজনদের সবার মতামত নিয়েই তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বায়রা যে ধারা বদলের কথা বলছে, তা দেশের অনেক আইনেই রয়েছে। তাদের দাবি আসলে মামাবাড়ির আবদার। এটি অন্যায়ও বটে।’

সিআর আবরার উল্লেখ করেন, এখন মানব পাচারের ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। তাই আইন বদল করা উচিত হবে না।

মন্তব্য পড়ুন 0