বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জ্বালানি তেলের পরিশোধনক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নেওয়া একটি প্রকল্প ১১ বছরেও চূড়ান্ত হয়নি। এর মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করা হয়েছে ১০ বার। এতে ব্যয় বেড়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।

গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট ও আমদানি করা ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) পরিশোধন করে জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হয়। দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে। তবে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা না বাড়ায় পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ছে প্রতিবছর।

এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) সৈয়দ মেহদী হাসান বলেন, ৮০ শতাংশ বিপিসির ও ২০ শতাংশ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। শতভাগ বিপিসির অর্থায়নে করতে সরকারের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিপিসি বলছে, অর্থায়নসংক্রান্ত বিষয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতায় দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এখন জ্বালানি বিভাগের পরামর্শে শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে করা হবে বলে ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই এটি জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হবে। তবে বিপিসির তহবিল থেকে দুই বছর ধরে উদ্বৃত্ত টাকা সরকার নেওয়ায় অর্থায়ন নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

স্বাধীনতার আগে থেকে জ্বালানি তেল পরিশোধনের কাজটি করছে বিপিসির অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। এই কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন পরিশোধনের সক্ষমতা আছে তাঁদের। নতুন করে ৩০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে ওই প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ওই সময় এটির ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এখন এটি ছাড়িয়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকা।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি বদলেও গেছে। পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমছে। এখন পরিশোধনক্ষমতা বাড়ানো হলে পেট্রল, অকটেন রপ্তানি করা লাগবে। তাই সবকিছু মূল্যায়ন করে এগোনো উচিত।
ম তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, দেশে পেট্রল ও অকটেন আমদানি করার প্রয়োজন হয় না। পরিবহনের জন্য ডিজেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে হয়। তবে পরিশোধিত তেল আমদানির চেয়ে ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধন করা হলে লিটারে পাঁচ টাকার মতো সাশ্রয় হয়। গত বছর পরিশোধিত তেল আনা হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টন। এবারও একই লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। পুরোটা দেশে পরিশোধন করা গেলে বছরে ২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। আর ৩০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে সাশ্রয় হতো দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিপিসি বলছে, আমদানি খরচ কমাতে ‘লঞ্চিং মডার্নাইজেশন রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড এক্সপানশন (বিএমআরই) অব ইস্টার্ন রিফাইনারি’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। নানা জটিলতায় ২০১২ সালে প্রকল্পটি বাতিল করে ইআরএল-২ নামে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়নের জন্য কারিগরি নকশা তৈরি করতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের কোম্পানি টেকনিপের সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। নকশা তৈরি করতে তিন বছর সময় নেয় টেকনিপ। প্রসঙ্গত, ১৯৬৮ সালে ১৫ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতার মূল ইউনিটটি স্থাপন করেছিল টেকনিপ।

২০১৬ সাল পর্যন্ত ওই প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেকনিপকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। সূত্র বলছে, দফায় দফায় আলোচনা করেও কয়েকটি বিষয়ে টেকনিপের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এর মধ্যে অন্যতম নির্মাণের পর চালু করার আগেই দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে চায় টেকনিপ। এটি কোনোভাবেই মানতে রাজি নয় বিপিসির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৬ থেকে (প্রকল্পটি নিয়ে) কাজের গতি বাড়ানো হয়েছে। মাঝে করোনার জন্যও কিছুটা পিছিয়ে গেছে। বিপিসিকে শতভাগ অর্থায়ন করতে বলা হয়েছে। তবে টেকনিপ রাজি না হলে আবার আগ্রহী ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে।

প্রকল্পটির বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, চিন্তাভাবনা করতেই ১১ বছর লেগে গেছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বদলেও গেছে। পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমছে। এখন পরিশোধনক্ষমতা বাড়ানো হলে পেট্রল, অকটেন রপ্তানি করা লাগবে। তাই সবকিছু মূল্যায়ন করে এগোনো উচিত।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন