বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত পাঁচ মাসে প্রাণ গেল পাঁচজনের। সর্বশেষ ব‌লি হ‌লো ১২ বছ‌রের শিশু কামাল উদ্দিন। বোতল কুড়া‌তে খা‌লে নেমে‌ছিল শিশু‌টি। এরপর ত‌লি‌য়ে যায়। তিন দিন পর উদ্ধার হ‌লো তার মর‌দেহ। প্রাণহা‌নির পরও নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়ার কাজ শেষ করতে পারেনি সিটি করপোরেশন বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দায় এড়াতে বারবার দোহাই দেন নির্মাণকাজের।

কিন্তু বারবার কেন এ দুর্ঘটনা ঘটছে? চট্টগ্রামের নালাগুলো কেন এমন মৃত্যুকূপ হয়ে উঠল? একটি প্রকল্প শেষে কিছুদিন যেতে না যেতেই সেটিকে খুঁড়ে ফেলা হচ্ছে আরেকটি প্রকল্পে। প্রকল্পের চক্করে পড়ে শহরের কোনো সড়কই বেশি দিন ঠিকঠাক থাকে না, হাঁটার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না, নালা-নর্দমাগুলো বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে থাকে বছরের পর বছর।

দেশ এখন ‘উন্নয়নের জোয়ারে’ ভাসলেও চট্টগ্রাম আটকে আছে জলাবদ্ধতায় ও অরক্ষিত নালায় পড়ে নগরবাসীর মৃত্যুতে। এর বদৌলতে এলাকায় এলাকায় ‘মৃত্যুকূপ’ দেখতে পাচ্ছি। যেগুলো একের পর এক টেনে নিচ্ছে তরতাজা মানুষকে। ছালেহ আহমেদ গেলেন, সাদিয়া গেলেন, সবশেষ শিশু কামালকে প্রাণ দিতে হলো। এখন নগরবাসীর মনে প্রশ্ন হলো এই মৃত্যুকূপ ও মৃত্যুমিছিলের শেষ কোথায়?

বেশ অবাক করা ব্যাপার হলো, ব্রিটিশবিরোধী দুঃসাহসী অবদানের জন্য যে শহরকে ‘বীর চট্টলা’ বলা হয়, তার নগরবাসীকে দেখভালের জন্য কি প্রকৃত কোনো অভিভাবক নেই? বীর চট্টলার নাগরিকেরা এভাবে প্রতিনিয়ত অরক্ষিত নালায় পড়ে প্রাণ হারাবে। এত এত প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা সিটি মেয়র বা সিডিএর চেয়ারম্যান হলেন, কেউই কি অরক্ষিত নালা-ড্রেনে পড়ে মৃত্যুর সমাধান দিতে পারছে না!

default-image

বন্দরনগর চট্টগ্রামের জন্য ১৯৬৯ সালে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে একটি আমেরিকান প্রতিষ্ঠান। তারা চট্টগ্রাম শহরের ভেতরে ৭০টি খালের জরিপ করেছিল। এর মধ্যে তারা চাক্তাই খালের দৈর্ঘ্য ৩৪ হাজার ৫০ ফুট পেয়েছিল। কিন্তু এ খালের পুরো জায়গা যত্ন করে সংরক্ষণ করতে না পারায় চরমভাবে মূল্য দিতে হচ্ছে। তেমনি মির্জা খালসহ আরও বেশ কিছু খালের জায়গা হাওয়া হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে ৩৪টি খালের সংযোগ দেখেছিলেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসার বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, খাল রয়েছে মাত্র ২২টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে ১৮টি খালের বেশি অস্তিত্ব পাননি। সরকারের সেবাদানকারী সংস্থাগুলো পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা করছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি তা বাস্তবায়ন করেনি।

পরে ১৯৯৫ সালে সিডিএর তত্ত্বাবধানে মহাপরিকল্পনা হয়। এরপর ২৫ বছর কেটে গেছে, কিন্তু মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলো না। এ কারণে বছরের পর বছর নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। আরএস ম্যাপ অনুযায়ী খালের জায়গা উদ্ধার করতে হবে। দখলদারদের নাম প্রকাশ করে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের শক্ত হতে হবে। এ ছাড়া মানুষের অভ্যাসগত সমস্যার জন্য এখন জরিমানার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা ভেবে দেখতে হবে।

বেশ দুঃখজনক ব্যাপার হলো অরক্ষিত ড্রেন-নালায় পড়ে মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় সরকারি দুটি সংস্থাই একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বলছে, দুদিকে ফুটপাত করলেও খালের মুখটি অরক্ষিত করে রেখেছে সিডিএ। তাই এর দায় নিতে হবে সিডিএকে। অন্যদিকে সিডিএ বলছে, খালের মালিকানা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। তাই খালের মুখে সুরক্ষা নিশ্চিতের দায়িত্বও তাদের। দায় এড়ানোর এ প্রবণতা প্রমাণ করে সেবা সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই।

মোদ্দা কথা হলো, উন্নয়ন ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মিস ম্যানেজমেন্টের কারণে নালা-খালে পড়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াই উন্নয়নকাজ করায় এমন দুর্ঘটনা বেশি বেশি ঘটছে। তাই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান এবং ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হবে। ড্রেনগুলোর ডিজাইন, নালায় স্ল্যাব বসানো, নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া এবং নালাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা উচিত। পাশাপাশি চট্টগ্রামের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক নগর–পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের মাধ্যমে পরিপূর্ণ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ যেকোনো মূল্যে অরক্ষিত নালা-খাল নিরাপদ করতে হবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ই–মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন