ফাঁকফোকরের মধ্যে প্রকৃতি চলে না। প্রকৃতি তার নিজের গতিতে চলে। কারোনাকালে প্রকৃতি রক্ষার শিক্ষা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।
default-image

৯ মাসের বেশি সময় ধরে আমরা দেখছি মহামারিতে আক্রান্ত অন্য এক পৃথিবী। কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাবে কী প্রভাব ঘটল প্রকৃতিতে? বেশ বড় পবিবর্তন হয়তো আসেনি, তবে মানুষের যে প্রকৃতিকে যত্ন করা দরকার অথবা প্রকৃতির ওপর অত্যাচার কমালে একটি সুস্থ প্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন আসে, তা কোভিড-১৯ আমাদের দেখিয়েছে। বেশ কয়েকটি সূচক বলছে, করোনাকালে প্রকৃতি তার পুরোনো চেহারা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছে।

করোনাকালে কক্সবাজারের উপকূলে ও সৈকতে এবার মানুষের আনাগোনা ছিল না বললেই চলে। সে সময় বেশিসংখ্যক কচ্ছপ ডিম পাড়তে পেরেছে। আগের বছরের তুলনায় তা ৩২ শতাংশের বেশি। সমুদ্রসৈকতের আশপাশে দেখা গেছে ডলফিন ও তিমি। কলাতলী সৈকতের খুব কাছাকাছি প্রায় ৫০টি ডলফিনের দল দেখা গেছে। গভীর সমুদ্রের বিরল কয়েক জাতের ডলফিনও ছিল এ দলে। সমুদ্রে জেলেদেরও জাল ফেলে মাছ ধরার হার কম বলেই তারা চলাচলে বেশি জায়গা পেয়েছে। হাওরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে করোনাকালে পরিযায়ী পাখিরা বেশি খাবার পেয়েছে এবং খুব ভালো অবস্থায় ফিরে গেছে নিজেদের প্রজননভূমিতে। আশা করি এবার শীত মৌসুমে বেশি সংখ্যায় পরিযায়ী পাখি আমাদের দেশে ফিরে আসবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

নদীতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। নদীর চরে যেসব পাখি ডিম পাড়ে ও বাচ্চা ফোটায়, তাদেরও দিনকাল খুব ভালো গেছে। আর জেলেরা এ বছরই নদীতে তুলনামূলক কম নামায় মাছের প্রজনন হয়েছে বেশি। তার প্রমাণও আমরা পেয়েছি। যেকোনো বছরের তুলনায় এবার ইলিশ ধরা পড়েছে বেশি। সিলেটসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে পর্যটকদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার ফলে বনের প্রাণীরা অবাধে প্রজনন সুবিধা পেয়েছে।

মানুষের এ সংকটকালে প্রকৃতি একটা নতুন বার্তা দিয়ে গেল। তাদেরও বাঁচতে দিতে হবে। আর তা না করলে মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে। মানুষের বিপর্যয় কাকে বলে কোভিড-১৯ তার বড় উদাহরণ। করোনাকালের এ শিক্ষা শিখতে শিখতেই আমরা আবার প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। সব জায়গা আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

করোনাকালে কোনো কোনো জায়গায় আমরা উল্টো চিত্রও দেখেছি। তবে এর সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিছু কিছু অভয়ারণ্যে মানুষ সবার অগোচরে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করেছে। হালদা নদীতে বেশিসংখ্যক ডলফিন জালে আটকা পড়ে মারা পড়েছে। এপ্রিল মাসের শেষ ভাগে শতাধিক কচ্ছপ কক্সবাজার সৈকতে উঠে আসতে দেখা গেছে। জেলেদের জালে আটকা পড়ে একটি তিমিও মারা গেছে। গত বছরের তুলনায় মারা পড়েছে বেশিসংখ্যক বনবিড়াল আর মেছো বাঘ।

মানুষের এ সংকটকালে প্রকৃতি একটা নতুন বার্তা দিয়ে গেল। তাদেরও বাঁচতে দিতে হবে। আর তা না করলে মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে। মানুষের বিপর্যয় কাকে বলে কোভিড-১৯ তার বড় উদাহরণ।
default-image

মানুষের এ সংকটকালে প্রকৃতি একটা নতুন বার্তা দিয়ে গেল। তাদেরও বাঁচতে দিতে হবে। আর তা না করলে মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে। মানুষের বিপর্যয় কাকে বলে কোভিড-১৯ তার বড় উদাহরণ। করোনাকালের এ শিক্ষা শিখতে শিখতেই আমরা আবার প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। সব জায়গা আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যারা বলেছিল কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিন সৈকতের একটি অংশ বুনো প্রাণীর জন্য ছেড়ে দিতে হবে, তারাই এখন সৈকতের সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে জেলেরা বলল নদীতে ডলফিনের একটি ভালো অভয়ারণ্য দরকার, সেই জেলেরাই আবার দল বেঁধে অবাধে মাছ ধরছেন। শীতের শেষভাগে কয়েকটি ছবি দেখেছি হাওরের। পাহারাদারদের অনুপস্থিতিতে পুরো হাওরের মা মাছ ধরে উৎসবে মেতেছিলেন জেলেরা। এ রকম ফাঁকফোকরের মধ্যে প্রকৃতি চলে না। প্রকৃতি তার নিজের গতিতে চলে। কারোনাকালে প্রকৃতি রক্ষার শিক্ষা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। আধুনিক কালে কোভিড-১৯ একটি বার্তা মাত্র। ভবিষ্যতে আরও বিপদ আসতে পারে।

প্রকৃতি সংরক্ষণেই সমাধান। আর এ সমাধানের দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। সব শ্রেণির মানুষের এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের মতো একটি দেশে এক সুন্দরবন ছাড়া আর কোনো ভালো বন নেই। সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক গুরুত্ব আমাদের অজানা নয়। বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আমাদের কাছে সব সময়ই গৌণ ছিল। সুন্দরবনের মতো আরও আমাদের উদাহরণ তৈরি করে সামনে আনতে হবে। এখন সময় এসেছে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে তার পরিচর্যা করা।

সীমান্ত দীপু: বন্য প্রাণী গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0