default-image

বৈধভাবে বিদেশে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেয় সরকার। কাগজে-কলমে অনুমোদিত এসব প্রতিষ্ঠানের নামেই বিদেশে যান কর্মীরা। কিন্তু যে এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছেন, তার নামও জানেন না অধিকাংশ কর্মী। তাঁরা চেনেন এলাকার পরিচিত দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী, যাঁর মাধ্যমেই হয় সব লেনদেন। এতে বাড়ে অভিবাসন ব্যয় ও নানা হয়রানি।

ব্যয় কমানো এবং হয়রানি বন্ধে অনেক দিন ধরেই মধ্যস্বত্বভোগীদের বৈধ প্রক্রিয়ায় আনার পরামর্শ দিচ্ছিল অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু। ২০১৮ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকেও এমন পরামর্শ দেওয়া হয়। এত দিনেও তা হয়নি। নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির সভায়। অবশেষে এসব মধ্যস্বত্বভোগীকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো. শামছুল আলমকে প্রধান করে কমিটি গঠিত হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে কর্মী পাঠানো এজেন্সিগুলোর মালিকদের সংগঠন বায়রা থেকে দুজন প্রতিনিধি থাকবেন। রিক্রুটিং এজেন্সির হয়ে কাজ করা সাব-এজেন্টদের (মধ্যস্বত্বভোগী) বৈধ প্রক্রিয়ায় আনা বা নিবন্ধনের প্রক্রিয়ার খসড়া তৈরি করে জমা দেবে কমিটি। চলতি সপ্তাহে কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রবাসী কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৌদি আরব যেতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। অথচ বেসরকারি খাতে একজন পুরুষ অভিবাসী দেশটিতে যেতে ব্যয় করেন সাড়ে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা। কোনো দেশের ক্ষেত্রেই সরকার নির্ধারিত ফি মানা হয় না। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ব্যয় গড়ে দেড় লাখ টাকা। কিন্তু একজন কর্মী গড়ে খরচ করেন সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি। পুরুষ কর্মীদের সবাই গড়ে ৪ লাখ টাকার বেশি খরচ করেন বিদেশে যেতে।

বিএমইটির মহাপরিচালক মো. শামছুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা মূলত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করেন। তারাই আনুষ্ঠানিক নিয়োগ দিতে পারে। কমিটি সম্ভাব্য সব দিক আলোচনা করবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করাই কমিটির উদ্দেশ্য।

রামরু বলছে, ১৯ শতাংশ লোক টাকা দিয়েও বিদেশে যেতে পারেন না। ২০১৮ সালে দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশ যেতে না পারায় ২ হাজার ৭০৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে কর্মীদের। আর ৩২ শতাংশ অভিবাসী বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়াসহ নানা হয়রানির মুখে পড়ছেন। নিয়মিত প্রতারিত হলেও অভিবাসনে আগ্রহীরা পরিচিত দালালে আস্থা পান। একজন কর্মীর পাসপোর্ট থেকে শুরু করে বিমানবন্দর ত্যাগ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দালাল কাজ করেন। দালালদের এমন দৌরাত্ম্যে প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়ে যায়। আর রিক্রুটিং এজেন্সির মাঠপর্যায়ে কোনো জনবল বা কাঠামো নেই। তাদের হয়ে দালালেরাই কর্মী সংগ্রহ করেন।

নিয়মিত প্রতারিত হলেও অভিবাসনে আগ্রহীরা পরিচিত দালালে আস্থা পান। তাঁরাই প্রতিটি ধাপে কর্মীর সহায়ক হিসেবে কাজ করেন।

তবে বায়রা বলছে, ১৯৮৫ সালে রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে দালালদের নিবন্ধন নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ফলে দালালদের সব দায় এসে পড়ত এজেন্সির ঘাড়ে। মামলা হতো এজেন্সির নামে। শেষ পর্যন্ত এটি বাতিল হয়ে যায়। এজেন্সি দালালদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। দালাল বন্ধ করতে এর আগে জেলায় জেলায় আলাদা করে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয় নেওয়ার সরকারি নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু দালাল নিবন্ধন করে হয়রানি বা অভিবাসন ব্যয় কমবে না। তবে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দালাল নিবন্ধন করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনের কাছে দালালের জবাবদিহি তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে বায়রার মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অভিবাসী কর্মীদের অনেকেই বিদেশে গিয়ে ভিসা সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েন। এরপর এলাকার পরিচিতদের কাছে সেই ভিসা বিক্রি করেন। তাই শুধু দালাল নিবন্ধন নয়, পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজজ (স্বয়ংক্রিয়) করতে পারলে স্বচ্ছতা তৈরি হবে।

তবে রামরু বলছে, অভিবাসন খাতের বিদ্যমান কাঠামোয় দালাল দূর করা সম্ভব নয়। তাঁদের আইনি কাঠামো এবং জবাবদিহির মধ্যে আনা প্রয়োজন। তাই তাঁদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করে প্রতিটি কাজের জন্য দালালদের ফি নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে।

দালাল নিবন্ধন করে বছরে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।
তাসনিম সিদ্দিকী, রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার

জেলা পর্যায়ের সরকারি জনশক্তি কার্যালয় বা রিক্রুটিং এজেন্সি বা বায়রা থেকে নিবন্ধ দেওয়া যেতে পারে। তবে বায়রা থেকে নিবন্ধন দেওয়া হলে বেশি কার্যকর হবে। বায়রা ৬৪ জেলায় কার্যালয় খুলতে পারে। একক এজেন্সির পক্ষে এটা সম্ভব নয়। আর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনশক্তি কার্যালয় থেকে দালাল নিবন্ধন দেওয়া হলে তা পারস্পরিক স্বার্থবিরোধী হতে পারে। ১৭ ধরনের সেবা দিলেও ২০১৩ সালে জারি করা অভিবাসন আইনে দালালদের রাখা হয়নি।

রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, দালাল নিবন্ধন করে বছরে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। বিদেশ যাওয়ার নামে প্রতারণাও কমবে। অভিবাসন খাতে সুশাসন তৈরি করতে বায়রার মাধ্যমে এ নিবন্ধন কাজ দ্রুত শুরু করা দরকার। ২০০১ সাল থেকে এ দাবি জানিয়ে আসছে রামরু।

মন্তব্য পড়ুন 0