default-image

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে গত তিন বছরে দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় কোনো উদ্যোগেই তেমন কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ এখন চীনের পাশাপাশি ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও যুক্ত করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশের এই মনোভাবের বিষয়টি অবশ্য চীনের অজানা নয়। ইতিমধ্যে চীন কূটনৈতিক আলোচনায় বলেছে, ভারতকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ যুক্ত করলে তাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, মিয়ানমারের নির্বাচনের (৮ নভেম্বর) পর দেশটিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রত্যাবাসন নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করার বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে চীন। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াংই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন। ওই টেলিফোন আলাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের নির্বাচন শেষে বেইজিংয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আবার শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আর মিয়ানমারের নির্বাচনের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা থমকে আছে। ৮ নভেম্বরের শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে বলে বাংলাদেশ আশা করে। তখন আবার প্রত্যাবাসনের আলোচনাটা শুরু করা যাবে। এ বিষয়ে চীনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। চীন নিয়মিতভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রসহ চারপক্ষের উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আয়োজিত দাতাদের সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরির বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন। রোহিঙ্গারা যাতে রাখাইনে ফিরে যেতে উৎসাহী হয়, এ জন্য তাদের মধ্যে আস্থা তৈরিতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

চীনের মধ্যস্থতার পরও প্রত্যাবাসনের আলোচনা গতি পাচ্ছে না। এ জন্যই কি বাংলাদেশ এখন আসিয়ান, মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ ও জাতিসংঘের সংস্থাকে যুক্ত করার বিষয়টি সামনে আনছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ চীন প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এরই মধ্যে আলোচনার প্রক্রিয়ায় চীন যুক্ত হয়েছে। ভারত আগ্রহী হলে যুক্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বলছি, যেসব দেশ মিয়ানমারের প্রতিবেশী, মিয়ানমারে উল্লেখ করার মতো বিনিয়োগ আছে এবং দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো, এমন সব দেশ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনুরোধ জানাতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের পাশাপাশি আমরা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছি। কারণ, বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে রাখাইনে তাদের প্রত্যাবাসন। তাই চীন ও ভারতের পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। কারণ, শেষের দুই দেশের মিয়ানমারে বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। আবার মিয়ানমারের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কও ভালো। এ বিষয়টি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের স্বার্থে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।’

ঢাকা, ইয়াংগুন এবং নিউইয়র্কে কর্মরত বাংলাদেশের কূটনীতিকেরা বলছেন, রাখাইনে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে মিয়ানমার সরকারকেই। কিন্তু রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গেলে তাদের জীবিকা, স্বাভাবিক চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ, আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতের এখন সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ এসেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিবেশী হিসেবে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে ভারতের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের শুরু থেকেই মানবিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে ভারত। যদিও এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে ভারতকে এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী জোরালোভাবে পায়নি বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0