বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম ২৫ মাচে৴র ভয়াল রাতে লালমাটিয়ায় নির্মাণাধীন এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ স্বল্প সময়ের জন্য ওঠামাত্রই বিপজ্জনক ঢাকা শহর ত্যাগ করে তাঁরা দুজন হেঁটে কুষ্টিয়ার দিকে চলতে শুরু করেন। কুষ্টিয়া ছিল আমীর-উল ইসলামের নির্বাচনী এলাকা। ৩০ মার্চ তাঁরা ভারত সীমান্তে পৌঁছান। সেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা নিকটবর্তী এক স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত বিদ্রোহী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদস্যদের জন৵ কিছু অস্ত্র ও গোলাগুলি সাহাযে৵র আবেদন জানান। সেই আবেদনের সূত্র ধরে বিএসএফের সর্বভারতীয় প্রধান কে এফ রুস্তমজি সেদিন সন্ধ্যায়ই দিল্লি থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছান। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলামকে ১ এপ্রিল দিল্লি নিয়ে যান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতে আলাপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কেননা, বিদেশিদের এমনভাবে অস্ত্রশস্ত্র দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র প্রধানমন্ত্রীরই রয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শ

default-image

সে সময় বেপরোয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিম৴ম আক্রমণে পূর্ব বাংলা থেকে ভারতে আসা শরণার্থীর সংখ্যা দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা অনেক বেড়েছে। ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তাজউদ্দীন আহমদ পূর্ব প্রতিশ্রুত সাক্ষাতের জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারি বাসভবনে যান। তাজউদ্দীনের অনুরোধ শোনার পর সহানুভূতির সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে দুটি পরামর্শ দেন। প্রথমত, পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার পক্ষে যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়ে থাকে, তবে তা বিশ্ববাসীকে জানানো দরকার। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের জন্য যদি অন্তব৴র্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়ে থাকে, তবে কেবল সেই সরকারের অনুরোধেই সাড়া দেওয়া ভারতের জন্য সম্ভব হতে পারে। তাঁদের মধে৵ আর কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তা জানা না গেলেও সম্ভবত পরবর্তী দুই দিনে আরও দুটি বৈঠক সম্পন্ন হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে ইন্দিরা গান্ধীর বেতার বক্তৃতা সম্প্রচারের এক প্রস্তাব তাজউদ্দীন আহমদ গ্রহণ করেন। এরপর অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ও আমীর-উল ইসলামের সহায়তায় তাজউদ্দীন আহমদ ৬ এপ্রিলের আগে এক বেতার বক্তৃতা তৈরি করেন।

এই বক্তৃতায় পাকিস্তানের নৃশংস অত্যাচারের বিবরণ, তার প্রতিক্রিয়ায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইবিআর), ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যদের স্বতঃস্ফূত৴ বিদ্রোহ, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধযুদ্ধ চালানোর জন্য অধিনায়ক নিয়োগ, বিদ্রোহী বাঙালি যোদ্ধাদের পাশাপাশি ছাত্র-শ্রমিক-জনতার মিলিত সংগ্রাম, পূর্ণ স্বাধীনতা অজি৴ত না হওয়া পর্যন্ত সেই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সংকল্প, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এই মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেওয়ার আবেদন, পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিবগ৴কে বিদ্রোহী নতুন সরকারে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়। বক্তৃতাটি তাজউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। কিন্তু তিনি নিজে কোন দায়িত্ব থেকে এসব ঘোষণা করছেন এবং স্বাধীনতা অজ৴নের জন্য আদৌ কোনো মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে কি না, এমন বিষয় উল্লেখ থেকে বিরত থাকেন।

মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত

৮ এপ্রিল থেকে আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ পর্যায়ক্রমে কলকাতায় ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান, তুরায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আগরতলায় খন্দকার মোশতাক আহমদ ও কনে৴ল (অব.) এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে বিশদ আলোচনা করেন এবং সব৴সম্মতভাবে মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তারপরই স্বাধীনতাযুদ্ধ চলমান রাখার সেই প্রথম বেতার বক্তৃতাটি শিলিগুড়ির কাছাকাছি এক অজানা স্বল্প ক্ষমতার বেতারকেন্দ্র থেকে ১০ এপ্রিল প্রচার করা হয়। পরদিন ১১ এপ্রিল তা অল ইন্ডিয়া রেডিওর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী আম্রকানন-বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করেন। সেই মন্ত্রিসভা স্বল্প সময়ের জন্য সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের কাছে আত্মপ্রকাশ করে। সবকিছু মোটামুটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়। কেবল একটি বিষয়ে পরে কিছু বিপত্তি দেখা দেয়।

সম্ভবত ধরে নেওয়া হয়, এর আগে ১৫ থেকে ২৪ মার্চ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সংকট নিষ্পত্তির আলোচনাকালে আওয়ামী লীগ প্রধানের উপদেষ্টা যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবং তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে যদি মন্ত্রিসভা গঠন করা যায়, তবে সেই মন্ত্রিসভার বৈধতা ও যোগ্যতা নিয়ে কোনো বড় প্রশ্ন উঠবে না। তেমন প্রশ্ন ওঠেনি, তবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর থেকেই মন্ত্রিসভার প্রায় প্রতে৵ক সদস্যই নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, তিনি নিজে কি ওই পদটির (অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী) জন্য যোগ্যতর ব্যক্তি নন? এসব কথা ক্রমে নানাভাবে বিস্তার লাভ করে।

পরে ৭ মে দিল্লির বৈঠকে বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার অনুরোধের জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখনই বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান এবং অস্ত্র সরবরাহের অপারগতা প্রকাশ করার পর মুক্তিযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ নানাভাবে প্রকাশ পায়। সেসব হতাশার কথায় তাজউদ্দীন আহমদ যোগ না দেওয়ায় এমন ধারণারও সৃষ্টি হয় যে তাঁর নিস্পৃহ আচরণ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার মধে৵ কোথাও একটা মিল রয়েছে। ক্রমে এসব গুঞ্জন ভারত সরকারের সর্বোচ্চ মহলেও পৌঁছায়।

জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকের অনুরোধ

১০ জুন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে রায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে খুব শিগগির বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠানের অনুরোধ করেন। তিনি তাজউদ্দীনকে আরও জানান, তাঁর আপত্তি না থাকলে ১৯ জুন মেঘালয় রাজে৵র তুরায় এই অধিবেশনের সব আয়োজন করে দেওয়া হবে। তাজউদ্দীন এতে সম্মত হন। এত অল্প সময়ের মধে৵ এত মানুষকে জড়ো করায় অসুবিধা বিবেচনা করে পরে এই অধিবেশন পিছিয়ে দিয়ে হিমালয়ের পাদদেশ শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠানের কম৴সূচি স্থির করা হয়। তাজউদ্দীন সম্ভবত উপলব্ধি করেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের কাছে তিনি আস্থাভাজন কি না, এ বিষয়টি ভারত সরকার যথাশিগগির পরিষ্কার হতে চায়। তবে তিনি এ-ও জানতেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিরা মূলত জানতে উৎসুক যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, সেই পথেই অগ্রগতি ঘটতে চলেছে কি না।

এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের বেশির ভাগ ছিলেন নবাগত। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেখা যায়, আওয়ামী লীগের দ্রুত বধ৴মান জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে মনোনয়ন দেওয়ার মতো পুরোনো সদস্য আওয়ামী লীগে তত বেশি নেই। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে স্বায়ত্তশাসন ও বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে বামপন্থার অনুসারীরা মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠা করা এনডিএফের প্রতি অবিচল অনুগত থেকে যান আতাউর রহমান খান ও আবদুস সালাম খানের অনুসারীরা। তাঁরা বিরত থাকেন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগে যোগদানের বিষয়ে। এরপর ১৯৬৬ সালে ৬ দফার বিরুদ্ধে আইয়ুব খানের নির্যাতন যখন নেমে আসে, তখন আওয়ামী লীগের আরও অনেক পুরোনো অনুসারী রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। প্রায় ১৪ বছর ধরে দল ছেড়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি চলমান ছিল। ফলে ১৯৭০ সালে এই সমুদয় শূন্য পদের পূরণ ঘটে পূর্ব বাংলার সচ্ছল ও সৌভাগ্যবান মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা প্রার্থীদের মাধ্যমে। তাঁদের অনেকেই ২৬ মার্চ পাকিস্তানি হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার পরে দেশের অভ্যন্তরেই থেকে যান এই বিবেচনায় যে যদি সামরিক শাসকদের আনুকূলে৵ কোনো সুবিধা পাওয়া যায়। পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া এ রকম সুযোগসন্ধানীর সংখ্যা ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংবাদ বুলেটিন দ্য পিপল পরিবেশিত খবর অনুসারে, জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) ৫৭ জন এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) ১০০ জনের বেশি।

অথচ যাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে এসেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দেখা যেত প্রবাসী সরকারের আঞ্চলিক কাউন্সিল গঠন ও মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটমেন্ট-সংক্রান্ত কাজে অধিক আগ্রহ। অপেক্ষাকৃত প্রবীণ জনপ্রতিনিধিরা যেখানে দলের নেতৃত্বের প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, সেখানে নতুন জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য তৃণমূলের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ইস্যু, তথা তরুণদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার বিষয় নিয়ে বেশি ব৵স্ত থাকতেন।

তাজউদ্দীন সম্ভবত উপলব্ধি করেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের কাছে তিনি আস্থাভাজন কি না, এ বিষয়টি ভারত সরকার যথাশিগগির পরিষ্কার হতে চায়। তবে তিনি এ-ও জানতেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিরা মূলত জানতে উৎসুক যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, সেই পথেই অগ্রগতি ঘটতে চলেছে কি না।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তখন কিছুটা স্থবির। এই যুদ্ধ গতিশীল করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং কবে তার ফল পাওয়া যাবে, সে কথা সবাই প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকেই শুনতে চাইতেন। ভারতে মুক্তিফৌজের আশ্রয় ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নতুন কমান্ডো বাহিনী প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অতি সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোভিয়েত সহযোগিতা লাভের জন্য যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করা হয়েছে, সেসব বিষয়ে পূর্ণ গোপনীয়তার নিশ্চয়তা বিধানে তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসব বিষয়ে কিছু অগ্রগতি ঘটার পর, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধযুদ্ধ পুনরুজ্জীবনের কিছু বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ার পর, সংশ্লিষ্ট নানা জিজ্ঞাসার উত্তর দেওয়া সহজ হতো। প্রতিরোধযুদ্ধের বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্তের প্রশ্ন উঠেছিল এই কারণে যে ইতিমধে৵ ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ পরিচালনার নামে মধ্য মাপের কিছু অত্যুৎসাহী নেতা কলকাতার সার্কাস অ্যাভিনিউয়ে বাংলাদেশ মিশন থেকে প্রতিদিন ‘শত্রুপক্ষের বিরাট হতাহত’ হওয়ার খবর অনুদান পাওয়া ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রদেশে প্রচার করে যেতেন। যেগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। (চলবে)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন