তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে করা মামলায় প্রবীণ রাজনীতিক, লেখক ও প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিক ও তাঁর ভাই শামসুল আলমকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর হাকিম আমিরুল হায়দার চৌধুরী এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শামসুজ্জোহা মানিক ব-দ্বীপ প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী। ব-দ্বীপ প্রকাশনের ইসলাম বিতর্ক নামের একটি বইয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো বিষয় থাকার অভিযোগে গত সোমবার রাতে শামসুজ্জোহা ও তাঁর ভাইকে নিজ নিজ বাসা থেকে শাহবাগ থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বইটির ছাপা প্রতিষ্ঠান শব্দকলি প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী ফকির তসলিমকেও তাঁর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় মামলা করে পুলিশ।
গতকাল শামসুজ্জোহা, শামসুল আলম ও ফকির তসলিমকে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির করে তাঁদের সাত দিনের রিমান্ড চান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক জাফর আলী বিশ্বাস। শুনানির সময়ও প্রবীণ এই লেখকের হাতকড়া পরানো ছিল। শুনানি শেষে আদালত শামসুজ্জোহাকে পাঁচ দিন, শামসুলকে এক দিন এবং তসলিমকে দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত বছর মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ঘটনায় সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধেও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় মামলা করা হয়। পরে ধারাটি বাতিলের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।
জানতে চাইলে আইনজীবী শাহ্দীন মালিক গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারার এ ধরনের প্রয়োগ বাক্স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, শামসুজ্জোহার ব-দ্বীপ প্রকাশন থেকে ইসলাম বিতর্ক বইটি প্রকাশিত। বইটি ছাপেন ফকির তসলিম উদ্দিন। এ বইটি বঙ্গরাষ্ট্র ডটকম নামের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কাসহ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অজ্ঞাতনামা আসামিদের কাছে থাকা বইটি উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী উদয় কে বসাক রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করে আদালতে বলেন, শামসুল আলম বুয়েট থেকে পাস করে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তিনি ইসলাম বিতর্ক বইয়ের লেখকও নন, প্রকাশকও নন। তিনি কিছুই জানেন না। এই আইনজীবী আরও বলেন, শামসুজ্জোহা অসুস্থ। তাঁর হার্টে সমস্যা আছে। তিনি একজন বয়স্ক লোক।
ফকির তসলিম উদ্দিনের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম আদালতে বলেন, তিনি প্রকাশকের দেওয়া বইটি শুধু ছাপিয়েছেন। তিনি কোনো অপরাধ করেননি।
আদালত চত্বরে শামসুজ্জোহা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পরে তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর লেখালেখি ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর ৪৬টি বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বই হলো আর্য জন ও সিন্ধু সভ্যতা। ইসলাম বিতর্ক বইটি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন লেখার সংকলন। পুলিশ গ্রেপ্তারের সময় তাঁর বাসার মালামাল তছনছ করেছে বলে জানান তিনি।
অবশ্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ‘তাঁর বাসায় অভিযান চালিয়ে বইপত্র জব্দ করেছি। বাসার মালামাল তছনছ করা হয়নি।’
শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই শামসুজ্জোহা অসুস্থ। কয়েক দিন ধরে তাঁকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল।
এসব বিষয়ে গতকাল পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে—এমন বিষয় থাকায় ইসলাম বিতর্ক বইটি জব্দ ও বইমেলায় এর স্টল গত সোমবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বইটির অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। তাই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এই মামলা করা হয়েছে। স্টল থেকে বইটির ছয়টি কপি জব্দ করা হয়। নীলক্ষেত ও কাঁটাবন এলাকা থেকে বইটির আরও ৭৫টি কপি জব্দ করে পুলিশ।
ক্ষোভ ও নিন্দা: ব-দ্বীপ প্রকাশনের স্টল বন্ধ এবং তিনজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে বই বাজেয়াপ্ত বা লেখক-প্রকাশকের গ্রেপ্তার নিন্দনীয়, যা মুক্তচিন্তার প্রতিপক্ষ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করবে। বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুযায়ী, ব-দ্বীপ প্রকাশন যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে জামায়াত-হেফাজতের অনুসারী মৌলবাদীদের বই কীভাবে মেলায় বিক্রি হয়, এর জবাব বইমেলার কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন