বিজ্ঞাপন

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭২ শতাংশ বেশি লবণাক্ততা এবং দীর্ঘদিন বজ্রসহ বৃষ্টি না হওয়াকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নদী গবেষক ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে তাঁরা এখনো আশাবাদী, প্রজনন মৌসুম জুন মাসের শেষ পর্যন্ত কার্পজাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ) মা মাছের ডিম ছাড়ার নজির রয়েছে।

গতকাল ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত হালদা নদী তীরের দুই উপজেলা রাউজান ও হাটহাজারীর মোট চারটি হ্যাচারি পরিদর্শন করে ও আহরণকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতবারের তুলনায় এবার ডিমের পরিমাণ অনেক কম। তাঁরা আগে যেখানে একেকটি নৌকায় ১০ থেকে ১২ বালতি ডিম সংগ্রহ করতেন, এবার সেখানে ২ থেকে ৩ বালতি ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন। গত মঙ্গলবার থেকে নদীতে শত শত নৌকায় ডিম আহরণকারীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ডিম সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সেই উৎসব ফিকে হতে শুরু করে।

ডিম ছাড়তে মা মাছ বজ্রপাত আর বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের যেকোনো পূর্ণিমা ও অমাবস্যার কয়েক দিন আগে ও পরে মা মাছ হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে। তবে গত মঙ্গলবার রাতে এবং বুধবার দুপুরে বজ্রপাত ও বৃষ্টি ছাড়াই নদীতে দুই দফায় নমুনা ডিম ছেড়েছিল মা মাছ।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই উপজেলার ৪টি সরকারি হ্যাচারি ও ১৪৫টি মাটির কুয়ায় ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের কাজ চলছে। প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা তাঁদের সহযোগিতা করছেন।

হাটহাজারীর মদুনাঘাট হ্যাচারিতে ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের কাজ তদারকিতে থাকা সাতকানিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত শর্মা বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ওই হ্যাচারিতে ৫০ থেকে ৬০ বালতি ডিম রেণু ফোটানোর জন্য এনেছেন আহরণকারীরা। মাদার্শা মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে দায়িত্বে থাকা চন্দনাইশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এখানে ১০৬টি নৌকার ২০০ জন আহরণকারী ১১০ বালতি ডিম রেণু উৎপাদনের জন্য এনেছেন।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ৩০০ নৌকার প্রতিটি ১ কেজি করে নমুনা ডিম আহরণ করেছে। দুই দফায় মোট আহরণের পরিমাণ সাড়ে ৩০০ কেজি হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। তবে তৃতীয় দফায় পুরোদমে ডিম ছাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আশানুরূপ পরিমাণ দেখছি না। এটা হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। তবে আমরা আশাবাদী, আবারও ডিম ছাড়বে মা মাছ। সে সময় বজ্রসহ বৃষ্টি হলে পরিমাণ বাড়তে পারে।’

নদীর মদুনাঘাট থেকে সর্তারঘাট পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, অন্তত দুই তীরের ১২ থেকে ১৫টি স্থানে শত শত নৌকা নিয়ে আহরণকারীরা ডিম আহরণ করেন। রাউজানের পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের আজিমেরঘাট, পশ্চিম কাগতিয়া, নাপিতের ঘাট, হাটহাজারীর রামদাশ মুন্সিরহাট, আমতুয়া, গড়দোয়ারা ইউনিয়নের নয়াহাট, মাছুয়াঘোনাসহ আরও একাধিক স্থানে ডিম পাওয়া গেছে।

এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যায় আধা ঘণ্টা বজ্রসহ বৃষ্টি হলেও মঙ্গলবার কোনো বৃষ্টি হয়নি। তবে বুধবার সকালে সামান্য বৃষ্টি হয় নদী এলাকায়। এর মধ্যে প্রথম দফায় দুই দিন নমুনা এবং তৃতীয় দফায় গতকাল পুরোদমে ডিম ছাড়ে মা মাছ।

হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এবার আশানুরূপ ফল পাইনি। এর কারণ ইয়াসের কারণে নদীতে লবণাক্ততা ৭২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন বজ্রসহ বৃষ্টি না হওয়া।’ তিনি বলেন, ‘পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, গত ২০ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ছিল নদীর পরিবেশ। এ কারণে প্রচুর মা মাছ বিচরণ করছিল। তবে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে হতাশা নেমে এল। তারপরও আবারও মা মাছ ডিম দেবে বলে আমরা আশাবাদী।’

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ রুহুল আমিন এবং রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোনায়েদ কবির বলেন, প্রজনন এলাকার ১০ কিলোমিটার এলাকা এখন সিসি ক্যামেরার আওতায় এনেছে নৌ পুলিশ। পাশাপাশি প্রশাসনের নজরদারিতে সব ধরনের বালু উত্তোলন এবং ড্রেজার ও যান্ত্রিক নৌযান চলাচল বন্ধ আছে।

মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন