default-image

প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র কৃষকের কৃষিঋণের অর্থ ‘এ-কার্ডে’ (ডেবিট কার্ড) পৌঁছে যাচ্ছে। কৃষক মোবাইল ফোনের সাহায্যে সেই কার্ড দিয়েই সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ প্রয়োজনমাফিক কিনতে পারছেন। তাঁরা ঋণ পরিশোধে ছয় মাস সময় পান। এতে ফসল তোলার পরই বিক্রির জন্য তাড়াহুড়ো করতে হয় না। ফলে বাজারে ভালো দাম ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন কৃষকেরা।

বেসরকারি সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ ও এমপাওয়ারের কারিগরি সহায়তায় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ইউএসএআইডি কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুর, ভোলা ও খুলনার চারটি উপজেলার দেড় হাজার কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে এ-কার্ডের মাধ্যমে এই সুবিধা পাচ্ছেন। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষিঋণ ও কার্ডের সেবা দিচ্ছে ব্যাংক এশিয়া। এক বছর ধরে প্রান্তিক চাষিরা সহজ শর্তে ও ১০ শতাংশ সুদে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ পাচ্ছেন। ঋণের টাকা কৃষকের এ-কার্ডে জমা থাকে। মূলত কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে কার্ডটি ইস্যু করা হয়।

ঢাকায় প্রথম আলোর কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ‘প্রান্তিক কৃষকের ব্যাংক কৃষিঋণ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব তথ্য জানানো হয়। কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।

গোলটেবিল বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলম বলেন, দেশের ৫৮ শতাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক। তাঁদের জমির পরিমাণ ১ হেক্টরের নিচে। এই প্রান্তিক চাষিরাই অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তিনি বলেন, বেশি সুদে ঋণ নেওয়াই প্রান্তিক কৃষকদের চিরায়ত সমস্যা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও এনজিও এগিয়ে এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। কার্ডের মাধ্যমে কৃষিঋণ দেওয়া গ্রামবাংলায় ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ। এতে লেনদেনে খরচ কম। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে এ ধরনের কার্ড ব্যবহার করা যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের অনেক
সমস্যা। তাঁদের ঋণ পরিশোধের জন্য ফসল তোলার পরই কম দামে বিক্রি করতে হয়। তিনি বলেন, কেবল অর্থায়ন করে প্রান্তিক কৃষকদের এগিয়ে নেওয়া যাবে না। এ জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও বাজারজাতে সহায়তা দিতে হবে।

কার্ডে কৃষিঋণ দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ২০ হাজার টাকার সীমা বাড়াতে হবে। অর্থায়নের সঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে উদ্যোগটি টেকসই হবে। এ বিষয়ে পিকেএসএফের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণ নয়, কৃষকদের বর্তমানে উপযুক্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যার যতটা ঋণ দরকার তাকে ততটাই দেওয়া হয়। তদারকির মাধ্যমে ঋণের অর্থ পুরোটাই ফেরত আসছে।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের নির্বাহী পরিচালক এম এহসানুর রহমান বলেন, অশিক্ষিত কৃষকেরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারেন না, এমন প্রচলিত ধারণাটি মিথ্যা প্রমাণ করেছে ইউএসএআইডির এই প্রকল্প। তিনি বলেন, অর্থের সীমিত সীমা, কেবল কৃষি উপকরণ কেনায় কার্ড ব্যবহার ও হিসাব খোলার প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘ—এই তিন সমস্যা সমাধান করা গেলে সারা দেশে কৃষকের হাতে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

প্রান্তিক চাষিদের মাঝে কৃষিঋণ বিতরণ নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে বলে মত দেন কেয়ার বাংলাদেশের পরিচালক আনোয়ারুল হক। তিনি বলেন, একই সঙ্গে বিমার বিষয়টিও ভাবতে হবে। কৃষিঋণ দিয়ে কেবল উৎপাদন বাড়ালেই কৃষকেরা লাভবান হবেন—এমনটা ভাবা ঠিক নয়। এটির সঙ্গে বাজারব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা নিয়েও ভাবতে হবে।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, পিওএস মেশিন ছাড়াও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এ-কার্ড ব্যবহার করা যায়। আঙুলের ছাপসহ চারটি উপায়ে লেনদেন করতে পারেন কৃষকেরা। কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই হিসাব খোলা হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো সাধারণ এনজিওর মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ করে। এ-কার্ডের ক্ষেত্রে কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানো হয়।

ইউএসএআইডি কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের চিফ অব পার্টি বিদ্যুৎ কে মহলদার বলেন, জামানত ছাড়া নারী ও পুরুষ কৃষকেরা ঋণ পাচ্ছেন। সময়মতো সার, কীটনাশক কিনতে পারছেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত আড়াই কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

ফরিদপুরের কিষানি খালেদা বেগম বলেন, ‘কার্ডটা পাওয়ার আগে সমস্যায় ছিলাম। উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হতো। তবে বর্তমানে ১০ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে সঠিকভাবে মাঠের পরিচর্যা করে ভালো ফসল ফলাচ্ছি।’ তিনি ঋণ নিয়ে ২৪ মণ ধান উৎপাদন করেছেন। ১৭ মণ পাট বিক্রি করেন। সেই টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন।

কৃষিঋণ কার্ডের মাধ্যমে লাভবান হয়েছেন কৃষি উপকরণ বিক্রেতা মো. শাহজাহানও। তিনি বলেন, ‘কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থে কৃষি উপকরণ বিক্রি করছি। এ জন্য দোকানে আগের চেয়ে বেশি ও ভালো উপকরণ রাখতে পারছি। একই সঙ্গে কার্ডের কারণে নগদ টাকা বহনে ঝুঁকি কমে গেছে। যাতায়াত খরচ আগের মতো লাগে না।’

কেয়ার বাংলাদেশের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর তানিয়া শারমিন বলেন, ব্যাংকের কৃষিঋণের তথ্য ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে যাচ্ছে না। আবার কৃষিঋণের অধিকাংশই বড় কৃষকদের কাছে চলে যাচ্ছে। ব্যাংকে কীভাবে যেতে হবে কিংবা কীভাবে হিসাবের ফরম পূরণ করতে হবে সে বিষয়ে প্রান্তিক কৃষকেরা জানেন না। এ বিষয়ে কাজ দরকার।

ইউএসএআইডি বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সৈয়দ শিবলি বলেন, কৃষকদের জন্য এ-কার্ডটি শক্তি (পাওয়ার)। যখনই দরকার তখনই কৃষকেরা কৃষিপণ্য কিনতে পারছেন।

সোসাইটি ডেভেলপমেন্ট কমিটির (এসডিসি) নির্বাহী পরিচালক কাজী আশরাফুল হোসেন বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে হলে প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে হবে। কার্ডের ব্যবহারে সেই কাজটি সহজ হবে। কারণ এতে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। বিক্রেতাদের ব্যবসা বাড়ছে।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গওহার নঈম ওয়ারা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0