ফরমালিন নির্ণয়ের ধরনও ভিন্ন

ফরমালিনের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করা নেই

বিজ্ঞাপন

খাদ্যে ফরমালিনের সহনীয় মাত্রা কত, দেশে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে গবেষণাগারগুলো পরীক্ষা করে শুধু ফরমালিনের পরিমাণটি বলে দিচ্ছে৷ মানুষের শরীরের জন্য এর ক্ষতিকর দিকটা এ থেকে নির্দিষ্টভাবে বোঝার উপায় নেই৷
আবার যেসব সংস্থা ফরমালিন পরীক্ষা করছে, তারা ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্র ও পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ফলে ফরমালিন পরীক্ষাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে৷
এ অবস্থায় পুলিশসহ সরকারের তিনটি সংস্থা খাদ্যে ফরমালিনবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে৷ এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) নিজেরাই ফরমালিনের সহনীয় মাত্রা দুই পিপিএম নির্ধারণ করে ফেলেছে৷ একে মান ধরে তারা দণ্ডও দিচ্ছে৷ অভিযান পরিচালনাকারী বাকি দুটি সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর৷
সরকারি এসব সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ফরমালিনের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি৷ কারণ, বিভিন্ন ফল বা দ্রব্যে সহজাতভাবে প্রাকৃতিক ফরমালিন থাকে। এ ফরমালিন কোন ফলে কতটুকু থাকে, এ তথ্যও তাঁদের কাছে নেই। তবে তাঁরা বলেছেন, প্রাকৃতিক ফরমালিন একপর্যায়ে জৈবিক প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে বের হয়ে যায়৷
জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরির প্রধান মো. শফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা করার জন্য দিলে আমরা কেবল কতটুকু ফরমালিন আছে, তা জানিয়ে দিই। ভালো-খারাপ নিয়ে কোনো মন্তব্য করি না।’ তবে একটি সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। এই ল্যাবরেটরিতে ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় হাই পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমোটোগ্রাফি (এইচপিএলসি) মেশিন দিয়ে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) মাছ ও দুধে ফরমালিনের উপস্থিতি পরীক্ষার জন্য একটি কিট তৈরি করেছে বলে জানান সংস্থাটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাসিমা খান। ফলমূলে ফরমালিন শনাক্ত করার কিট তাঁরা চেষ্টা করেও করতে পারেননি। নাসিমা খান বলেন, ‘বিভিন্ন ফলে বিভিন্ন মাত্রায় প্রাকৃতিক ফরমালিন থাকে। এর সীমা নির্ধারণ আমরা করিনি। এটি করা হলে ভালো-মন্দের দিকটা পরিষ্কার হবে৷’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, খাদ্যপণ্যে ফরমালিন মিশ্রণ পরীক্ষার জন্য তারা ছয় ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজিটাল ফরমালডিহাইড মিটার (জেড-৩০০)৷ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন মিঞা দাবি করেন, ‘মিটারটি খাদ্যের সহজাত ফরমালিনের বাইরে যদি আলাদাভাবে ফরমালিন দেওয়া হয়, তাও শনাক্ত করতে পারে।’ মিটারের এই বৈশিষ্ট্য পরীক্ষিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই মিটারকেই গ্রহণযোগ্য বলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।’
এ মেশিনটি ছাড়া অধিদপ্তর ফরমালডিহাইড সোয়াব ডিটেক্টর, ফরমালডিহাইড ডিপ স্টিক, ফরমালডিহাইড ডিটেকশন কিট এবং ক্রোমোটিক অ্যাসিডের সঙ্গে সালফিউরিক অ্যাসিডের মিশ্রণ দিয়ে ফলমূল পরীক্ষা করে থাকে। তবে অধিদপ্তরের নিজস্ব গবেষণাগার নেই। শেষোক্ত পদ্ধতিটির জন্য অধিদপ্তর বিএসটিআই বা পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগার ব্যবহার করে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা জেড-৩০০ মেশিনটি ব্যবহার করলেও বিএসটিআই তা ব্যবহার করে না৷ জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) কমল প্রসাদ দাস বলেন, ‘মেশিনটি সম্পর্কে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।’
ফরমালিন শনাক্ত করার অভিযানের সময় বিএসটিআই তাত্ক্ষণিকভাবে ফল পানিতে ডুবিয়ে এতে ক্রোমোট্রপিক অ্যাসিড দিয়ে পরীক্ষা করে৷ পানিতে বেগুনি গোলক তৈরি হলে তাতে ফরমালিন আছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
শরীরে ফরমালিনের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ না করে এই পরীক্ষা কতটুকু যুক্তিযুক্ত—এমন প্রশ্নের জবাবে কমল প্রসাদ দাস বলেন, ‘সরকার মান নির্ধারণ করবে। খাদ্যে ফরমালিন মেশানো আইনত দণ্ডনীয়, এর নিরিখেই খাদ্যে ফরমালিন পাওয়া গেলে তার জন্য দণ্ড নির্ধারিত হয়।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও খাদ্যে ফরমালিনবিরোধী অভিযানে নিরাপদ খাদ্য আইনের (২০১৩) ২৩ ধারাকে ব্যবহার করে। এতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য (যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট), কীটনাশক (ডিডিটি, পিসিবি তেল) বা অন্য কোনো বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য মজুত, বিপণন বা বিক্রি করা যাবে না৷
এই আইনে ফরমালিন মেশানোর কথা উল্লেখ থাকলেও এর মাত্রা কী হবে, কোন নিরিখে এটি বিবেচিত হবে, এসবের কিছুই উল্লেখ নেই। এ কারণে ফলমূলের প্রাকৃতিক ফরমালিনও এর বিপনণকারীকে দণ্ডের মুখে ফেলছে৷
এই অবস্থায় ১১ জুন থেকে ডিএমপি রাজধানীর প্রবেশপথের তল্লাশিচৌকি বসিয়ে ফরমালিন শনাক্তের বিশাল অভিযান পরিচালনা ও দণ্ড নির্ধারণ করছে৷ তারা মান ধরেছে দুই পিপিএম আর ফরমালিন শনাক্তে ব্যবহার করছে আলোচিত-সমালোচিত জেড-৩০০ ফরমালডিহাইড মেশিন৷
জানতে চাইলে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান দাবি করেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মানব শরীরের জন্য সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করেছে শূন্য দশমিক ১৫ পিপিএম৷ সেটাকে মাথায় রেখে ফরমালিনের মাত্রা ধরা হয়েছে ২ পিপিএম৷’
খাদ্যে ফরমালিন পরীক্ষার জটিলতা এড়াতে ফরমালিনের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করাটা খুবই জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ। তিনি বলেন, সরকারের সব সংস্থার একটি অভিন্ন ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি মেনে চলা দরকার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন