বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন-বিষয়ক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
এফএওর ২০১৩ সালের সর্বশেষ বৈশ্বিক পরিসংখ্যান প্রতিবেদন বলছে, ফল উৎপাদনের দিক থেকে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল বিশ্বের পর্যায়ক্রমে শীর্ষস্থানে রয়েছে। আর মোট ফল উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে ২৮তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
তবে দুই বছর ধরে বাংলাদেশের ফলের উৎপাদন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ থেকে দ্রুত গতিতে বাড়ছে—এই তথ্য উল্লেখ করে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, ২০১৫-এর পরিসংখ্যান দিয়ে হিসাব করলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও এগোবে। এখনো এই হিসাব এফএও প্রকাশ করেনি।

default-image

এফএওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। আর হেক্টরপ্রতি ফলের উৎপাদন ১০ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনের এই দুই দিকেই বাংলাদেশের ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। অথচ ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে ফল উৎপাদন বেড়েছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।
চলতি বছর বাংলাদেশ আম রপ্তানি শুরু করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের যুক্তরাজ্য শাখা বাংলাদেশ থেকে আম আমদানি শুরু করেছে। গত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এফএওর উদ্যোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ওয়ালমার্ট ৩৫ টন আম কিনেছে।
এফএও সূত্রে জানা গেছে, ওয়ালমার্টের দেখাদেখি যুক্তরাজ্যের আরও কয়েকটি খুচরা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান গত আমের মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে ৬৫ টন আম আমদানি করেছে। ইউরোপের ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন খুচরা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে আম আমদানির জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে।
এফএও বাংলাদেশের প্রতিনিধি মাইক রবিনসন এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে আম রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন, বাংলাদেশের আম যখন পাকে তখন বিশ্ববাজারে অন্য কোনো দেশের আম আসে না। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে ক্রেতারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের আম গ্রহণ করেছে। তারা বলছে, বাংলাদেশের আম বিশ্বের অন্যতম সুস্বাদু ফল। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বছরে ১ হাজার টন আম রপ্তানি করাও সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত চার বছরে আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেয়ারা ও আনারসের মতো দেশি ফল উৎপাদন দ্রুত হারে বাড়ছে। সংস্থাটির ২০১৫ সালের প্রধান ফসলের পরিসংখ্যান-বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১৮ প্রজাতির ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এবং উৎপাদন নিয়মিতভাবে বাড়ছে।
বিবিএসের হিসাবে গত চার বছরে দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন বেড়েছে পেয়ারার। এই সময়ে দেশে পেয়ারার ফলন দ্বিগুণ হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে কাজী পেয়ারা চাষের মধ্য দিয়ে উন্নত জাতের পেয়ারা চাষ দেশে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত ছয়টি উন্নত জাতের পেয়ারা এবং বেসরকারিভাবে আমদানি হওয়া থাই পেয়ারার চাষে দেশে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে।
বিবিএসের হিসাবে ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে পেয়ারার ফলন প্রায় আড়াই লাখ টন হবে বলে সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, এ বছর পেয়ারার উৎপাদন ৩ লাখ টন ছাড়াবে।
বিবিএসের হিসাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ লাখ টন লিচু, ৪ লাখ ৭০ হাজার টন পেঁপে, ৪০ হাজার টন কমলা, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন আনারস ও ১ লাখ ৫৫ হাজার টন কুল উৎপাদিত হয়েছে। আর মোট ফল উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ১ কোটি টন।
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৪৫ প্রজাতির ফল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১ কোটি টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেড়েছে আমের উৎপাদন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদিত হয়েছিল ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। আর এ বছর তা বেড়ে ১৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ থেকে লেবু, পেয়ারা ও আম মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বিক্রি হতো। গত মে থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য আম রপ্তানি শুরু করেছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ফল রপ্তানি থেকে আয় আড়াই গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৮৮ কোটি টাকার ফল রপ্তানি করে। ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ এই দুই অর্থবছরে তা বেড়ে ৭৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চার বছর ধরে ফলের রস বা জুসের বাজারেও বাংলাদেশ প্রবেশ করছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ফলের জুস রপ্তানি হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ফলের রস রপ্তানি করে ৬৫০ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতিবছর ফল উৎপাদন ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। আম, পেয়ারা ও কুল বা বরইয়ের বেশ কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গত পাঁচ বছরে ৮৪টি ফলের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর ফলে হেক্টরপ্রতি ফলন আগের তুলনায় বেড়েছে।
বারি-৬ আম, আম্রপালির মতো আমের নতুন জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। বারি-৬ আম পাহাড়ি এলাকার জন্য। এ বছর দেশের তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপকভাবে আম চাষ হয়েছে। পেয়ারার ক্ষেত্রে থাই পেয়ারা ও বারি-৮ পেয়ারার চাষ নিয়মিতভাবেই বাড়ছে। নতুন এই জাতগুলোর কারণে দেশে ফলের উৎপাদন প্রতিবছর ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0