বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বড় বড় নৌ দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটিগুলো যেসব সুপারিশ করে, তার বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয় না।
মীর তারেক আলী, অধ্যাপক, নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির হিসাবে গত বছর দেশে নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭৭টি। এতে প্রাণ হারান ১২৭ জন। আর ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪০৫টি নৌ দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ৬৬৭ জন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মীর তারেক আলী প্রথম আলোকে বলেন, নৌযান ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দুর্ঘটনা এড়াতে ফিটনেস সনদ অবশ্যই থাকতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে আসবে।

তবে নিবন্ধিত নৌযানগুলোর কতটি ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করেনি, তা খতিয়ে দেখা হয় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্যভান্ডারেও এ তথ্য পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৮৬। এর মধ্যে গত অর্থবছরে ফিটনেস হালনাগাদ হয়েছে ৭ হাজার ৯০৬টির। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, নিবন্ধিত নৌযানের তথ্য থাকলেও কতগুলো নৌযানের ফিটনেস সনদ নেই, তা বলা সম্ভব নয়। যে সফটওয়্যারের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হয়, সেখানে এমন কোনো ‘অপশন’ নেই।

আর নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল কবীর বলেন, কত সংখ্যক নৌযানের ফিটনেস নেই, সে তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। যেসব নৌযানের নিবন্ধন আছে, সেগুলোর ফাইল পরীক্ষা করে বলা যাবে কোন কোন নৌযানের ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করা হয়নি। তবে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কোন কোন নৌযানের ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করা হয়নি, সে বিষয়ে সব ফাইল যাচাই করে দেখা হয় না।

তাহলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়, সে প্রশ্নের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল কবীর বলেন, ‘অভিযান পরিচালনাকালে যেসব নৌযানের সমস্যা ধরা পড়ে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

নৌযানের নিবন্ধন ও ফিটনেস দেখতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরে ১৮ জন পরিদর্শক আছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২৫ জন পরিবহন পরিদর্শকও ফিটনেসসহ নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়গুলো দেখেন। এই পরিদর্শকেরা গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৭৭০টি নৌযানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এগুলোর বেশির ভাগই নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ হালনাগাদ না করার কারণে হয়েছে বলে নৌ আদালতের প্রসিকিউটিং অফিসার বেল্লাল হোসাইন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গত জুলাই মাসে দেশের প্রধান তিনটি নদীবন্দর এলাকায় ৩৬টি নৌযানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৫টিরই নিবন্ধন ছিল না।

সারা দেশে মোট কত নৌযান চলছে, সেই তথ্যও সরকারের কাছে নেই। ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের নদ-নদীতে ৭ লাখ ৪৫ হাজার নৌযান চলাচল করে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৮৪ হাজার যাত্রীবাহী এবং ২ লাখ ৬১ হাজার পণ্যবাহী নৌযান।

জরাজীর্ণ লঞ্চেও সনদ

সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ নৌপথের ২৪টি যাত্রবাহী লঞ্চের বেশির ভাগই জরাজীর্ণ ও জোড়াতালি দেওয়া। জোড়াতালি ঢাকতে অনেকগুলোতে দেওয়া হয়েছে রঙের প্রলেপ। কোনো কোনোটির রংও উঠে গেছে। হেডলাইট নেই বেশির ভাগের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লঞ্চমাস্টার বলেন, জরাজীর্ণ হলেও প্রতিবছরে ফিটনেস সনদ পেয়ে যায় লঞ্চগুলো। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য বলেন, ‘সার্ভেয়াররা ওই সব লঞ্চের (জরাজীর্ণ) ফিটনেস সনদ দিলে আমাদের করার কিছু থাকে না।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর আবু জাফর মো. জালাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। তবে আরও জনবল নিয়োগ দিলে নৌযানের মালিকেরা আমাদের কাছে আসবে। নিয়মিত সার্ভে করতে হলে দুই বছর পরপর ডকিং করতে হয়। সব নৌযানের ডকিং করার মতো নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ডকইয়ার্ড দেশে নেই।’

নৌ চলাচল নিরাপদ করতে এ বিষয়ে আরও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক মীর তারেক আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বড় বড় নৌ দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করে, তার বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয় না। বারবারই বলা হয় লোকবল কম। তবে লোকবল বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না।


[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন