পেট্রলবোমার আগুনে যন্ত্রণায় কাতর রংমিস্ত্রি নূরুন্নবী (২৫)। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন পরিণতিতে দুশ্চিন্তায় পরিবার। এমন দুঃসময়ে যখন চোখে অন্ধকার দেখছে পরিবারটি, তখন তাদের জন্য কিঞ্চিৎ আলো হয়ে উঠল কয়েকজন ‘স্বপ্নবাজ’ তরুণ-তরুণী। তাঁরা নিয়েছেন নূরুন্নবীর চিকিৎসার ব্যয়ভার ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব।
এই তরুণ-তরুণীরা ‘স্বপ্ন’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে গোলাপ ফুল নিয়ে ঢাকা ও রাজশাহীর রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। বিক্রি করেছেন ফুল। আয় করা টাকা নিয়ে গতকাল রোববার হাজির হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দগ্ধ নূরুন্নবীর পাশে।
শুধু নূরুন্নবী নন, বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আরও দগ্ধ আটজনকে প্রায় লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে সংগঠনটি। ফুলের টাকায় এসব হতদরিদ্র মানুষের জীবন নতুন করে সাজাতে এই তরুণ-তরুণীদের স্বপ্নে গতকাল বার্ন ইউনিটে সৃষ্টি হলো এক আবেগঘন মানবিক পরিবেশের।
২০১৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর শুরু সংগঠনটির পথচলা। সদস্য ৫০০ ছাড়িয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টায় এসব জেলায় চলে সংগঠনটির কার্যক্রম। কার্যক্রম বলতে শিক্ষাসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক কাজ।
দগ্ধ নয়জনের মধ্যে নূরুন্নবীসহ চারজন পেট্রলবোমায়, চারজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং একজন শিশু রান্নাঘরের আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়েছে। সংগঠনটির সদস্যরা জানান, তাঁরা দগ্ধ নয়জনের মধ্যে শুধু নূরুন্নবীর চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়েছেন। সুস্থ হলে তাঁকে পুনর্বাসন করবেন। বাকি আটজনের পরিবারকে দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা।
৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে যাওয়ার পথে গাজীপুর চৌরাস্তায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ঝলসে যায় নূরুন্নবীর শরীর। ছয় বছরের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন স্ত্রী আবিয়া বেগম। ওই তরুণ-তরুণীদের সহায়তা পেয়ে গতকাল আবিয়া চোখ মুছতে মুছতে প্রথম আলোকে বললেন, ‘মনে হইতাছে, মাথা থেকে একটু হইলেও কষ্টের বোঝাটা নামছে।’
গত শুক্রবার তৃতীয় সন্তানের জনক হয়েছেন পেট্রলবোমায় দগ্ধ ট্রাকচালক মো. বাদশা (৩৮)। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিশুসন্তানের মুখ দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর।
সংগঠনটির সহায়তায় অনেক বেশি কৃতজ্ঞ পেট্রলবোমায় দগ্ধ দিনমজুর জমির আলী (৪৪) ও জিলকদ আহমেদের (১৮) হতদরিদ্র পরিবার।
অর্থ সাহায্য পেয়ে যেন শক্তি ফিরে পেয়েছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পুড়ে যাওয়া নেজাম হোসেন, মোস্তফা, মো. রাজুসহ চারজনের পরিবার। রান্নাঘরে চুলার আগুনে পুড়ে যাওয়া ১১ বছরের শিশু মুন্নি আক্তারের পোশাকশ্রমিক মা-বাবাও বেশ খুশি।
সংগঠনটির সদস্য মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের এইচএসসির পরীক্ষার্থী এনামুল হক আরমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের মেসে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালান। কষ্টে থাকা মানুষগুলোর জন্য সবার সঙ্গে তিনিও ঢাকার পথে ফুল বিক্রি করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনিসা নাজনীন ও তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী মিথি বিশ্বাস জানান, ভালোবাসা দিবসে ফুল বিক্রি করে প্রকৃত ভালোবাসা দেখিয়েছেন তাঁরা।
সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র শাহীনুর রহমান জানান, এভাবেই দেশটা একদিন সত্যি সত্যিই হয়ে উঠবে স্বপ্নের বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন