বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিরাপদ ফেরি চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

৯ মাসের মাথায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে শরণার্থী পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যায়। অপেক্ষা না করে শরণার্থীরা দলে দলে দেশে ফিরতে থাকে। ভারতের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরের প্রায় ১৫ লাখ শরণার্থীর খাবার, চিকিৎসা, পানীয়জলের দায়িত্বে থাকা মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠান অক্সফামের অনেক টাকা বেঁচে যায়। বিলাতের প্রধান দপ্তর সিদ্ধান্ত দেয় শরণার্থী না থাকলে কাজ শেষ। টাকাপয়সা যা হাতে আছে, তা রেডক্রসের হাওলা করে তোমরা অফিস গুটিয়ে আগের কাজে মন দাও। রেডক্রস বাংলাদেশে পুনর্বাসনের কাজ করবে। অক্সফামের কলকাতা প্রতিনিধি ব্রাদার রেমন্ড কর্নিয়ার সেই আদেশ পছন্দ হয়নি। তিনি বেঁচে যাওয়া টাকাটা অধিকতর অর্থপূর্ণ কোনো কাজে ব্যয় করতে চেয়েছিলেন।

কানাডার নাগরিক রেমন্ড কর্নিয়ার চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিড স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন (১৯৫৮-১৯৬৫)। যুদ্ধের সময় শরণার্থী হয়ে কলকাতায় যাওয়া অনেক প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় সেই সময়। তাঁদের অনেককেই তিনি শরণার্থী কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করেন।

১৯৯৬ সালে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কাজে ঢাকায় এসেছিলেন রেমন্ড কর্নিয়ার। তখন আমি অক্সফামের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির দায়িত্বে ছিলাম। সাক্ষাতে একাত্তর সালে অক্সফামের কর্মকাণ্ডের নানা বিষয়ে তিনি জানিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগে থেকে চিনতেন। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর অন্য রকম একটা স্বপ্ন ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। ভালো বাংলা জানতেন ব্রাদার রেমন্ড। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সব খুলে বলেন, তারপর জানতে চান যেকোনো একটা খাতের কথা, যেখানে টাকাটা খরচ করলে অনেক মানুষের দেশের একটা দীর্ঘমেয়াদি উপকার হবে। বঙ্গবন্ধু মুখের পাইপটা নামিয়ে রেখে ব্রাদার রেমন্ডকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ওই ল্যান্ড রোভার নিয়ে যশোর হয়ে ঢাকা আসছ, নদী কেমনে পার হইলা? কতক্ষণ লাগছে? পারলে সেখানে কিছু করো, আমার যোগাযোগটা চালু আর নিরাপদ করা দরকার।’ সেদিনই সিদ্ধান্ত হয় অক্সফাম শরণার্থীদের থাকা–খাওয়ার জন্য বরাদ্দের উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে ফেরি কিনে দেবে সিঙ্গাপুর থেকে। সিঙ্গাপুরের শ্রমিকেরা রাত–দিন পরিশ্রম করে রেকর্ড সময়ের মধ্যে ফেরিগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করেন। চরম ব্যস্ততার মধ্যে বঙ্গবন্ধু খোঁজ রাখতেন ফেরি নির্মাণের অগ্রগতির। ফেরির নামকরণ নিয়ে আমলা–মন্ত্রীদের মোসাহেবিতে বিরক্ত ব্রাদার রেমন্ড আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধু কোনো মানুষের নামে ফেরিগুলোর নাম না রেখে ফুলের নামে নদীর নামে রাখতে বলেন। কেয়া, কেতকি তাঁরই দেওয়া নাম। রেমন্ডকে বলেছিলেন, ‘ব্রাদার, আমার মজবুত জিনিস চাই।’

মৃত্যুর সংবাদ শুনতে হয়নি, এটিই স্বস্তির

স্বস্তিদায়ক হচ্ছে, এখন পর্যন্ত পাটুরিয়ার ঘটনায় কোনো জান খেয়ানতের খবর আসেনি। মালের ওপর দিয়েই গেছে ২৭ অক্টোবর সকালের ফেরি ‘দুর্ঘটনা’। মাল গেলে মাল পাওয়া যাবে, জান গেলে তা মিলবে না। তাই ধন্যবাদ ‘কপাল’কে আর দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের। সর্বস্ব খুইয়ে জানে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলেছেন, ‘দৌলতদিয়ার ৫ নম্বর ঘাট থেকে ফেরিটি যখন মাঝনদীতে পৌঁছায়, তখনই সামনের দিকে ডান পাশে থাকা এক ছিদ্র দিয়ে গলগল করে পানি উঠতে শুরু করে।’ মুহূর্তের মধ্যে ফেরির ভেতর পানি জমে যায়। ফেরিতে পানি দেখে স্টাফসহ যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা চিৎকার শুরু করেন। বেগতিক দেখে ফেরির মাস্টার ইঞ্জিনের গতি বাড়িয়ে দেন। অল্প সময়ের মধ্যে ফেরিটি পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে পৌঁছায়। পন্টুনের সঙ্গে রশি না বাঁধতেই ফেরির ডালা নামিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় তিনটি ট্রাক তাড়াহুড়া করে ফেরি থেকে নেমে যায়। নামতে না পারাদের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ ১৭টি গাড়ি, দুটি প্রাইভেট কার ও ৮-১০টি মোটরসাইকেল ছিল ফেরিতে। ফেরি পুরোপুরি কাত হয়ে গেলে সেগুলোর সলিলসমাধি ঘটে। দু-একজন তাঁদের মোটরসাইকেল রক্ষার জন্য পানিতে ঝাঁপ দিলেও শুধু প্রাণ নিয়ে কূলে ফিরতে হয়। তাঁদের একজন অমল কান্তি ভট্টাচার্য আহত অবস্থায় পাটুরিয়া ঘাটে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেল ও মুঠোফোন নদীতে থেকে যায়। ফেরির মাস্টার যদি ইঞ্জিনের গতি না বাড়াতে পারতেন, মাঝদরিয়াতেই যদি তলিয়ে যেত এই ৪০ বছরের পুরোনো শাহ আমানত ফেরিটি। যদি ‘দুর্ঘটনাটি’ ঘটত মধ্যরাতে, ফেরিতে থাকত যাত্রীবাহী বাস আর তার ঘুমন্ত যাত্রীরা? তাহলে কি শুধু মালের ওপর দিয়েই যেত? জান বাঁচত নারী, শিশু, প্রবীণ যাত্রীদের?

দুর্ঘটনার অশনিসংকেত পেয়েও হুঁশ হয়নি

গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখ রাতে কিন্তু এমনই এক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল আরেক অতি পুরোনো ফেরি রানীগঞ্জ। সেদিন রাত ১১টার দিকে পদ্মা সেতুসংলগ্ন হাজরা চ্যানেলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ফেরির তলা ফেটে প্রবল বেগে পানি ঢুকতে থাকে। সারেং তাঁর কর্মীদের নিয়ে প্রথমে ফেরির সাবমার্সিবল পাম্প দিয়ে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করেন; কিন্তু কুলিয়ে উঠতে না পেরে ফেরির কর্মচারীরা সবাই মিলে বালু, কম্বল যা কিছু আছে সেগুলো দিয়ে যতটা সম্ভব ফেরিতে পানি ঢোকার রাস্তা বন্ধের চেষ্টা করেন। সারেং গতি বাড়িয়ে দ্রুত ঘাটের দিকে ফেরি নিতে থাকেন। কপাল ভালো, সেদিন তখনো ঘন কুয়াশা না পড়ায় ২০ মিনিটের মধ্যে বাংলাবাজার ঘাটে পৌঁছে যায় ফেরিটি।

ততক্ষণে ফেরির ওপরে পানি উঠতে শুরু করেছে। একে একে সব গাড়ি নামানোর পর সারেং ঘাটের উল্টো পাশেই ফেরিটি নোঙর করেন। পরবর্তীকালে ফেরির ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ফেরি থেকে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে গভীর রাতে এর ৯০ শতাংশ ডুবে যায়। সেই দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ফেরির সারেং ফজলুল করিম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম। আমার মাথাতে এটাই ছিল যে ঘাবড়ানো যাবে না। আমি ধৈর্য হারাই নাই আর জাহাজের কোনো যাত্রীকে বুঝতে দেই নাই যে এই ঘটনা ঘটেছে। কেউ বুঝেও নাই, কত বড় বিপদ থেকে আল্লাহ আমাদের বাঁচাইছে।’

এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, না চরম গাফিলতি

বর্ষায় নদীর স্রোতের গতি বেড়ে যাওয়ার পর যখন একের পর এক ফেরি গিয়ে পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন তাতে আমরা নাশকতার গন্ধ খুঁজলেও এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে ফেরিগুলোর আসলে জান শেষ হয়ে গেছে। স্রোতে তাল সামলাতে না পেরে ফেরিগুলো যখন-তখন সেতুতে গিয়ে মাথা কুটছিল, ফেরির ছাল–চামড়া উঠে যাচ্ছিল, যাত্রীদের মাথা ফাটছিল, তখন আমরা নাশকতার গন্ধ খুঁজছিলাম, ফেরির কর্মীদের শাস্তি দিয়ে সমাধানের পথের দিশা দিচ্ছিলাম। পরে জানা যায় অন্য কথা। বেশির ভাগ ফেরি নাকি তামাদি হয়ে গেছে। বাতিল, দুর্বল ও জরাজীর্ণ ফেরি দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে বছরের পর বছর। দেশের ৫৩ ফেরির ৪৭টিরই ফিটনেস সনদ নেই। পদ্মা সেতুর পিলারে যে চারটি ফেরি ধাক্কা দিয়েছিল, সেগুলোর একটিরও হালনাগাদ ‘ফিটনেস’ সনদ ছিল না। জীবনকাল পেরিয়ে গেছে ২০টির। এগুলোর মধ্যে পাঁচটির বয়স নাকি ৯৫ বছর। পদ্মা সেতুর পিলারে গত ২০ জুলাই যে রো রো ফেরি শাহ মখদুম ধাক্কা দেয়, সেটি তৈরি হয় ১৯৮৫ সালে। হালনাগাদ ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলছিল এত দিন। ১৯৮০ সালে থেকে চলাচলকারী ফেরি শাহজালাল ধাক্কা দেয় ২৩ জুলাই, এটিও মেয়াদোত্তীর্ণ জলযান। ৪০ বছরের বেশি পুরোনো শাহজালালের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ ছিল না। সেতুর পিলারে ধাক্কা দেওয়া ফেরি কাকলি তৈরি হয়েছে ১৯৭৪ সালে। এটিকে কোনোভাবেই আর নিবন্ধন বা ফিটনেস সনদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তার আগে ৯ আগস্ট ধাক্কা দেওয়া ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় গত ১৭ জুলাই।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) নৌযানের তালিকা অনুযায়ী, গতকাল ডুবে যাওয়া ফেরি আমানত শাহ ১৯৮০ সালে তৈরি। ৩৩৫ জন যাত্রী ও ২৫টি যান বহন করতে পারে এটি। ৮০৬ দশমিক ৬০ টন ওজনের ফেরিটি সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারে।

তদন্ত হোক গাফিলতির

যথারীতি একাধিক তদন্ত কমিটি হয়েছে। জনগণকে এসব কমিটির সীমা–পরিসীমা, দায়দায়িত্ব বা টার্মস অব রেফারেন্স নিয়ে খোলাসা করে কিছু বলা হয়নি। পদ্মা সেতুতে ধাক্কা মারার সময় থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি আর তার চালকদের দক্ষতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, ফেরির ফিটনেস নিরূপণ ইত্যাদি নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি। তাতে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের কী যায় আসে। এসবে তাদের চিন্তা–দুশ্চিন্তা উদয় হওয়ার কোনো আলামত নজরে আসেনি। আসন্ন ফেরিডুবির সব আলামত স্পষ্ট হওয়ার পরও বিশেষ করে ডিসেম্বরের ঘটনার পরও কেন কারও টনক নড়ল না, সেটা দেখা বড় জরুরি। আসলে টনক বলে কোনো বস্তু আছে কি না, সেটাও মেপে দেখতে হবে। দেখতে হবে যারা ঘটনার ঘণ্টা না পেরোতেই চটজলদি কাত–চিতের, ডোবা–ভাসার বিতর্ক তৈরির তাকত রাখেন, তাঁরা সময়ের এক ফোঁড়ের সময় কেন ঘুমিয়ে যান।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

nayeem 5508 @gmail. Com

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন